বাঙালিরা নিজেদের সত্তা এবং কর্ম নিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন যে, বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, সহিংসতা এবং সর্বোপরি আধিপত্যের মতো বিষয়গুলো সঠিক সময়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। যখন সবকিছু শেষ হয়ে যায়, তখনই কেবল বাঙালিরা নড়েচড়ে বসে; বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে শুরু করে এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যেত তার উপায় নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়ে। এরপর যারা এ নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না, তারা পুনরায় নিজেদের গতানুগতিক কাজের চক্রে ফিরে যায়। এভাবেই আবর্তিত হতে থাকে এই অন্তহীন বৃত্ত।
মক্কা চুক্তি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ ধরা হবে। বাংলাদেশের যুক্তি সহজ: সীমান্ত হত্যা, পানি আর ট্রানজিট — তিনটিতেই দরকষাকষির জায়গা এখন প্রায় শূন্য। এই লেখার দাবি, একটি যৌথ কাঠামো সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিতে পারে।

বাঙালির প্রকৃতি
এমন নয় যে বাঙালিদের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তাদের জড়তা এতটাই সুগভীর ও বিশাল যে, তারা কোনো আকস্মিক মোড় বা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অক্ষম। আর এ কারণেই ইতিহাসের এক হাজার বছর ধরে বাঙালিরা ক্রমাগত বিদেশি শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে—কখনো তুর্কি, কখনো আফগান, কখনো ব্রিটিশ, আবার কখনো পাকিস্তানি। এমনকি আজও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা ভারতীয় ও পাকিস্তানি আধিপত্যের রেশ বহন করছি, যার সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে চীনা ও রুশ প্রভাব।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কী? এটি কীভাবে বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে?
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
আমি নিজেও একজন বাঙালি হিসেবে বলতে পারি, আমরা আমাদের এই ভূখণ্ড এবং জীবনযাত্রাকে সহজতর করে তোলে এমন সব উপকরণে এতটাই আশীর্বাদপুষ্ট যে, জীবনের প্রতিবন্ধকতাগুলো অনুধাবনের অবকাশ আমাদের খুব কমই মিলেছে। অন্যদিকে, প্রতিকূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী, যারা বেঁচে থাকার জন্য সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, তারা যেকোনো বহিরাগত অনুপ্রবেশের বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক। অথচ আমরা সেই তুলনায় উদাসীন।
ড. ইউনূস ও তার কিছু উপদেষ্টার সার্বভৌম চিন্তাকে বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আলোকিত সমাজ, ব্যবসায়ী, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্র্যাসির সিনিয়র পর্যায়ের লোকরা ও ডিপস্টেট ভারত প্রভুর প্রতি বেয়াদবি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেটি বুঝেই ইউনূস প্রশাসনের যারা নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারে পদপদবি চান, তারা সমঝে চলেছেন। ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত, তারা ঢাকার ভারত ভক্ত কালচারাল সাব-সোসাইটিতে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন।
তবে মানুষের একটি অনিবার্য সহজাত প্রবৃত্তি বারবার আমাদের আক্রান্ত করেছে; আর তা হলো অধিক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সহজ ভাষায়, লোভ। যেমনটি আগে বলেছি, আমরা এতটাই আশীর্বাদপুষ্ট যে, আমাদের মধ্যে এই আকাঙ্ক্ষা কদাচিৎ উঁকি দিলেও তা কখনোই এতটাই প্রবল ছিল না যে আমরা অন্য কোনো ভূখণ্ড দখল করতে আগ্রহী হয়েছি। যদি প্রশ্ন ওঠে আমরা কেন অন্যকে আক্রমণ করি না বা কেন আমরা অন্যদের দ্বারা শাসিত হই, তবে তার উত্তর এই একই কারণের মধ্যে নিহিত।
নিজেদের অলসতা বা অসচেতনতার দায়ভার নেওয়ার আগে এটি মনে রাখা জরুরি যে, ভিন্ন ভিন্ন জাতির লোভই আমাদের জীবন ও জীবনধারাকে ধ্বংস করেছে। বাঙালির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনার সময় এই সত্যটি অবশ্যই সামনে আসা উচিত। আর সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আমাদের দুটি ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিশালী করতে হবে: প্রথমত, পারমাণবিক কাঠামো থেকে শুরু করে বিশ্বব্যবস্থা পর্যন্ত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে যা কিছু ঘটছে, তার যথাযথ বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন; এবং দ্বিতীয়ত, যারা জ্ঞান রাখেন, তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সঠিক বাস্তবায়নের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।



