Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কি বাংলাদেশের জন্য নতুন হুমকি, নাকি পুরোনো শোষণের নগ্ন রূপ?

সারকথা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির আসল অংক কী? বাংলাদেশ কি শুধুই ভারতের ডাম্পিং গ্রাউন্ড?

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ৫ মে ২০২৬•পড়তে ৯ মিনিট লাগবে
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কি বাংলাদেশের জন্য নতুন হুমকি, নাকি পুরোনো শোষণের নগ্ন রূপ?

আপনারা যারা ড্রয়িংরুমে বসে ভাবছেন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পতনে বাংলাদেশের জন্য আকাশ ভেঙে পড়ছে, তাদের কাছে আমার একটি ছোট্ট প্রশ্ন রয়েছে। 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনামলে আমরা ঠিক কী এমন 'আশীর্বাদ' পেয়েছিলাম, যার জন্য আজ আমাদের এত হাহাকার শুরু হয়েছে? এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা তিস্তার জল? নাকি সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মারা সাধারণ বাংলাদেশিদের জীবনের ন্যূনতম গ্যারান্টি?

সিএনএন, বিবিসি বা ভারতীয় মূলধারার মিডিয়ার শেখানো বুলি ভুলে গিয়ে একবার বাস্তবের আয়নায় তাকান। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় নিশ্চিত এবং তৃণমূল কংগ্রেস ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ার খবরের পর আমাদের দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে যে গেল-গেল রব উঠেছে, তা সত্যিই হাস্যকর। 

কারণ, সত্যিটা বলতে, দিল্লির মসনদে বা কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে যে-ই বসুক না কেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সবসময় একই সুতোয় গাঁথা; আর তা হলো শোষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং নিরঙ্কুশ আধিপত্য।

রাজনীতির এই নাট্যমঞ্চের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এমন এক অংক, যা 'হিন্দুত্ববাদ' বা 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং স্বার্থান্বেষী। সুতরাং, আবেগ সরিয়ে এই ভূ-রাজনৈতিক কপটতার মুখোশের আড়ালে তাকান, এই পরিবর্তন আসলে আমাদের জন্য কী বার্তা নিয়ে আসছে।

বন্ধুত্বের ফাঁকা বুলি বনাম কাঠামোগত শোষণের বাস্তব চিত্র

ভারত সবসময় আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাবি করে, বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক এখন 'সর্বোচ্চ সোনালী অধ্যায়ে' অবস্থান করছে। কিন্তু এই সোনালী অধ্যায়ের আসল রং কী? এটি কি সত্যিই সোনালী, নাকি আমাদের রক্তে রঞ্জিত?

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক-এর বাস্তব পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকান। বন্ধুত্বের এই ফাঁকা বুলির আড়ালে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি জিইয়ে রাখা হয়েছে। ঢাকাকে অত্যন্ত সুকৌশলে বানানো হয়েছে ভারতীয় নিম্নমানের পণ্যের একচেটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড (Captive Market)। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ যখনই ভারতে কোনো মানসম্মত পণ্য রপ্তানি করতে যায়, তখনই তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয় অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি (Anti-dumping duty), ট্যারিফ এবং নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ারের মতো অদৃশ্য দেয়াল।

এর চেয়েও ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় সীমান্তে। বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্ত হলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফেলানীর মতো সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দিয়ে যে সীমান্ত হত্যার নির্মম পরিসংখ্যান তৈরি হয়, তা কি কোনো 'অকৃত্রিম বন্ধুত্বের' প্রমাণ দেয়? দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে বিএসএফ-এর গুলিতে আমাদের সাধারণ নাগরিকরা প্রাণ হারাচ্ছেন, আর আমরা শুধু 'কড়া প্রতিবাদ' আর 'পতাকা বৈঠকের' প্রহসন দেখে আসছি।

সম্পর্কিত বিশ্লেষণ
তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

২০২৩ সালের ২৮ মের ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারওগলুকে পরাজিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়েছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের ভূরাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ।

রাকিবুল ইসলাম • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
সম্পূর্ণ পড়ুন →
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়, ফেলানীর মতো সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দিয়ে যে সীমান্ত হত্যা

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক পানি বণ্টন আইনের তোয়াক্কা না করে শুষ্ক মৌসুমে তারা একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, আর বর্ষায় বাঁধ খুলে দিয়ে আমাদের ভাসিয়ে দিচ্ছে। তিস্তা চুক্তি ও সীমান্ত সমস্যার মতো জীবন-মরণ ইস্যুগুলো স্রেফ রাজনৈতিক ফাইলে বন্দী হয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের মুলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

এই চরম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় কি সত্যিই আমাদের জন্য নতুন কোনো হুমকি, নাকি পুরোনো শোষণের হিসাব-নিকাশেই এক নতুন মোড়ক? বিজেপি আসুক বা তৃণমূল যাক, ভারতের 'লুক ইস্ট' (Look East) বা 'অ্যাক্ট ইস্ট' (Act East) পলিসির মূল ভুক্তভোগী তো এই বাংলাদেশই।

পশ্চিমা ও ভারতীয় কপটতা: 'পুতুল সরকার' ও ফ্যাসিবাদকে আশ্রয়

এবার আসুন ভারতীয় রাজনীতির চরম কপটতা এবং তাদের দ্বিমুখী নীতির কথায়। যে ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিজেদের 'বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র' বলে অহংকার করে, সেই ভারতই যুগের পর যুগ বাংলাদেশে একটি চরম স্বৈরাচারী, গণবিরোধী ও ফ্যাসিস্ট 'পুতুল সরকার'-কে অন্ধ সমর্থন দিয়ে গেছে। কেন? কারণ একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক এবং মেরুদণ্ডসম্পন্ন সরকার তাদের আধিপত্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।

ভারত সবসময় চেয়েছে বাংলাদেশকে এমনভাবে অস্থিতিশীল ও পরনির্ভরশীল করে রাখতে, যাতে এই দেশটি কখনোই একটি শক্তিশালী, সার্বভৌম ও অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউস হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। তাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে তাদের 'অখণ্ড ভারত' (Akhanda Bharat) এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদের দর্শনের অধীনে একটি 'স্যাটেলাইট স্টেট' বা করদ রাজ্যে পরিণত করা।

আর এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ভারতের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বস্ত সহযোগী ছিল আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা। বিনা ভোটে, নৈশভোটে এবং ডামি ভোটে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা একটি মাফিয়া সরকারকে ভারত নির্লজ্জভাবে সমর্থন জুগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের বুক চিরে ট্রানজিট ও করিডোরের নামে তাদের 'সেভেন সিস্টার্স'-এ পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর পথ পরিষ্কার করা হয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছে একটি বড় শূন্য।

কিন্তু যখন জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সেই ফ্যাসিস্ট সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল, তখন সেই তথাকথিত 'গণতান্ত্রিক' ভারত কী করল? তারা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সেই স্বৈরাচারী শাসককে, যার হাতে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার রক্ত লেগে আছে, নিজেদের দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় দিল! আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা যখন লেজ গুটিয়ে ভারতে পালিয়ে গেলেন, তখন প্রমাণ হয়ে গেল যে, ভারত মূলত বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব বা গণতন্ত্র চায় না; তারা শুধু তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের পাহারাদারদের চায়।

মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED

মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন

আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

লেখা জমা দিন →

ভোটের মাঠের মিথ্যাচার এবং চরম দ্বিমুখী নীতি

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কতটা বিষাক্ত এবং দ্বিমুখী, তা বুঝতে হলে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার দিকে তাকালেই চলবে। ভোটের মাঠে ভারতের কেন্দ্রীয় শাসকদল যখন 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' বা 'উইপোকা' বলে বিষোদগার করে, তখন তাদের সেই হুংকার কোথায় যায় যখন তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকাকে তাদের 'সবচেয়ে বিশ্বস্ত কৌশলগত মিত্র' বলে দাবি করেন?

এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বয়ান নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare)। এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA) ইস্যুকে হাতিয়ার করে তারা অভ্যন্তরীণ ভোটে উগ্র মেরুকরণ করছে, আবার ঠিক একইসাথে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় ঢাকাকে কাছে টানার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চরম দ্বিমুখী নীতি কি কেবলই রাজনৈতিক অন্ধত্ব, নাকি এক সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা? দিল্লির কাছে বাংলাদেশ কি শুধুই একটি ট্রানজিট রুট আর নিজেদের পণ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ড, নাকি প্রকৃত অংশীদার?

ভারতের নেতারা খুব ভালো করেই জানেন যে, বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির ঘাড়ের ওপর পা না রাখলে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (সেভেন সিস্টার্স) বাঁচতে পারবে না। অথচ, নিজেদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের খুশি করতে তারা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশিদের অমানবিক ভাষায় গালাগাল করেন। এই চরম ভণ্ডামির কোনো তুলনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাওয়া কঠিন।

সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং মুছে যাওয়া 'বাফার জোন'

পর্দার পেছনের আসল খেলোয়াড়দের দিকে তাকালে আপনি বুঝবেন, ভারতের নির্বাচন ও বাংলাদেশের রাজনীতি একে অপরের সাথে এতটাই গভীরভাবে যুক্ত যে, এটি সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে লড়াইটা কেবল হিন্দুত্ববাদ বনাম সেক্যুলারিজমের নয়। এখানে লড়াইটা হলো আঞ্চলিক আধিপত্যের। বিজেপির হিন্দুত্ববাদ ও ঢাকা-দিল্লি সমীকরণ আসলে একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ছকের অংশ।

আগে দিল্লির একটি দারুণ এবং কার্যকর অজুহাত ছিল। যখনই তিস্তা চুক্তি বা সীমান্ত হত্যা নিয়ে কথা উঠত, তখন কেন্দ্রীয় সরকার খুব সুকৌশলে দায় চাপাত কলকাতার রাজ্য সরকারের ওপর। "মমতা রাজি নন, তাই চুক্তি হচ্ছে না"—এই ছিল তাদের 'গুড কপ, ব্যাড কপ' খেলার মূল অস্ত্র।

দিল্লি (কেন্দ্রীয় সরকার) চায় পুরো পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে তাদের নিরঙ্কুশ অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ, যার জন্য বাংলাদেশের মাটি ও সহযোগিতা তাদের অপরিহার্য। অন্যদিকে, কলকাতা (রাজ্য সরকার) এতদিন তিস্তা বা ট্রানজিটের মতো ইস্যুতে দিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ঢাকাকে ব্যবহার করেছে।

বিশেষ সুপারিশ
মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের যৌথ প্রতিরক্ষায় যোগদান কেন অপরিহার্য?

মক্কা চুক্তি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ ধরা হবে। বাংলাদেশের যুক্তি সহজ: সীমান্ত হত্যা, পানি আর ট্রানজিট — তিনটিতেই দরকষাকষির জায়গা এখন প্রায় শূন্য। এই লেখার দাবি, একটি যৌথ কাঠামো সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিতে পারে।

রাকিবুল ইসলাম • অভিমত
সম্পূর্ণ পড়ুন →

কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডয়চে ভেলের সংবাদ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় নিশ্চিত হওয়ার পর, কলকাতা আর দিল্লির মাঝখানের সেই চিরচেনা 'বাফার জোন' বা ঢালটি আর থাকছে না।

রাজ্য ও কেন্দ্রে একই সরকার থাকলে কি তিস্তা চুক্তির জট খুলবে, নাকি এককেন্দ্রিক শক্তির উত্থানে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে? চীন যখন এই অঞ্চলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে হাজির, তখন নয়া দিল্লির এই আগ্রাসী রাজনৈতিক বিস্তার কি কেবলই তাদের অভ্যন্তরীণ বিজয়, নাকি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় সাউথ এশিয়ার বুকে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক দেয়াল তোলার মরিয়া চেষ্টা?

ভারতের কোণঠাসা অবস্থা এবং বেপরোয়া নীতি

একটি বিষয় আমাদের খুব গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে ভারত এখন চরমভাবে কোণঠাসা এবং বিপর্যস্ত। তাদের 'প্রতিবেশী প্রথম' (Neighborhood First) পলিসি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, পুরো সাউথ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যের ডমিনো (Domino) কীভাবে একের পর এক পড়ছে:

  • মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা: মালদ্বীপে 'ইন্ডিয়া আউট' (India Out) ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে আক্ষরিক অর্থেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কাও ভারতের ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে নিজেদের স্বাধীন অর্থনৈতিক পলিসি তৈরি করছে।
  • বাংলাদেশ: বাংলাদেশে তাদের বসানো পুতুল সরকার এবং সবচেয়ে বড় আজ্ঞাবহ দাস শেখ হাসিনার চরম পতনের মাধ্যমে ভারত এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় 'প্লেগ্রাউন্ড' বা খেলার মাঠটি হারিয়েছে।
  • নেপাল: আর ভারতের আধিপত্যের কফিনে সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে নেপাল। যে নেপাল একসময় ভারতের করদ রাজ্য বা 'স্যাটেলাইট স্টেট' হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই নেপালই আজ ভারতের চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। কালাপানি-লিপুলেখ সীমান্ত নিয়ে ভারতের মুখের ওপর নতুন মানচিত্র প্রকাশ করা থেকে শুরু করে কাঠমান্ডুর রাজনীতিতে দিল্লির 'মাইক্রোম্যানেজমেন্ট' চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া—নেপাল প্রমাণ করেছে তারা আর দিল্লির অঙ্গুলিহেলনে চলবে না। বেইজিংয়ের সাথে তাদের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেপাল থেকে এই চূড়ান্ত 'কিক আউট' হওয়া এবং বাংলাদেশে পুতুল সরকারের পতনের পর ভারত এখন সাউথ এশিয়ায় আক্ষরিক অর্থেই বন্ধুহীন। এই প্রবল হতাশা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরাজয়ের গ্লানি থেকেই তারা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে যেকোনো উপায়ে অস্থিতিশীল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। তারা চাইবে বাংলাদেশে এমন একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে, যাতে বিশ্ববাসীকে তারা দেখাতে পারে যে "দিল্লির হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অঞ্চল অচল"।

দুর্বল প্রতিবেশীর কোনো মিত্র থাকে না

উপসংহারে যাওয়ার আগে আমরা আপনাদের জন্য একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। যখন দেখবেন কোনো ভারতীয় নেতা ভোটের মাঠে 'অনুপ্রবেশকারী' বা 'উইপোকা' বলে বিষোদগার করছেন, আবার পরের দিনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সাথে 'সোনালী অধ্যায়ের' গল্প ফাঁদছেন—তখন কি আপনারা এই সস্তা অভিনয়ে আবারও প্রতারিত হবেন?

বাস্তবতা হলো, বিশ্বব্যবস্থার এই নিষ্ঠুর এবং স্বার্থান্বেষী সিস্টেমে দুর্বল প্রতিবেশীর কোনো বন্ধু থাকে না। ভারত কখনো আমাদের বন্ধু ছিল না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না; তারা কেবলই তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পাহারাদার। তাদের কাছে বাংলাদেশ কেবলই একটি বাফার স্টেট, একটি ট্রানজিট রুট এবং তাদের অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল বাজার।

যতদিন পর্যন্ত আমরা নিজেদের রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে, একটি শক্তিশালী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন ও স্বাধীন জাতীয় সিস্টেম এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষামূলক পলিসি তৈরি করতে না পারব, ততদিন এই শোষণের চক্র চলতেই থাকবে। 

পশ্চিমবঙ্গে কে জিতল বা হারল তা নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় ঝড় না তুলে, আমাদের বরং ভাবা উচিত—দিল্লির এই আগ্রাসী, হিন্দুত্ববাদী এবং আধিপত্যবাদী ভূ-রাজনৈতিক নকশা ভাঙার জন্য ঢাকা কতটা প্রস্তুত? আমরা কি আবারও কোনো পুতুল সরকারের অধীনে একটি 'স্যাটেলাইট স্টেট' হয়ে থাকব, নাকি একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সাউথ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করব? 

সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে, কারণ ইতিহাস দুর্বলদের ক্ষমা করে না।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

তুরস্কের নির্বাচনে এরদোয়ানের বিজয়: স্থিতিশীলতার প্রতীক নাকি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

২০২৩ সালের ২৮ মের ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারওগলুকে পরাজিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়েছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের ভূরাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ।

২৮ মে ২০২৩পড়ুন →
মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের যৌথ প্রতিরক্ষায় যোগদান কেন অপরিহার্য?অভিমত

মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের যৌথ প্রতিরক্ষায় যোগদান কেন অপরিহার্য?

মক্কা চুক্তি ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এতে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ ধরা হবে। বাংলাদেশের যুক্তি সহজ: সীমান্ত হত্যা, পানি আর ট্রানজিট — তিনটিতেই দরকষাকষির জায়গা এখন প্রায় শূন্য। এই লেখার দাবি, একটি যৌথ কাঠামো সেই জায়গাটা ফিরিয়ে দিতে পারে।

২৭ আগস্ট ২০২৬পড়ুন →
পুঁজিবাদঃ লাভের লড়াই নাকি বৈষম্যের খেলা?অভিমত

পুঁজিবাদঃ লাভের লড়াই নাকি বৈষম্যের খেলা?

পুঁজিবাদ হল একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপায় (যেমন কারখানা, জমি) ব্যক্তিদের মালিকানাধীন এবং বাজার মূলত সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই চাহিদা ও সরবরাহের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

২২ মার্চ ২০২৪পড়ুন →
ইসরায়েল-হামাস সংঘাত: ২০২৪ সালের নতুন বছরে ফিলিস্তিনের দৃশ্যপট কেমন?অভিমত

ইসরায়েল-হামাস সংঘাত: ২০২৪ সালের নতুন বছরে ফিলিস্তিনের দৃশ্যপট কেমন?

বিশ্ব যখন ২০২৪ সালের নতুন বছর উদযাপনে মত্ত, ফিলিস্তিনের মানুষ তখনো যুদ্ধ ও দখলদারির রুদ্ধশ্বাস ছায়াতলে দিনাতিপাত করছে।

৩১ ডিসেম্বর ২০২৩পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।