সংখ্যালঘুদের প্রতি ভারতের বৈষম্যমূলক নীতি
বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা এগিয়ে নিতে মিথ্যা দাবি প্রচার এবং ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে। সরকারের এসব কর্মকাণ্ড মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব ও ঘৃণ্য অপরাধের পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বিজেপি সরকার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের নেতা ও অনুসারীরা প্রায়শই সংখ্যালঘুবিরোধী মন্তব্য করে থাকে, যা সহিংসতাকে উসকে দেয়।” ২০১৯ সালে ভারত সরকার ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (NRC) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) পাস করে। যদিও এই বিতর্কিত আইনটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তবুও এর মাধ্যমে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান অভিবাসীরা দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে মুসলিম অভিবাসীদের এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহারের জন্য সরকারের প্রচেষ্টাও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অযোধ্যা মন্দির বিতর্ক এবং রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে ভোটারদের বিভক্ত করার অভিযোগ রয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে।মোদি কি ভারতের পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস দেখে ভীত?
ভারতে আমরা দাঙ্গা, লিঞ্চিং, গোষ্ঠীগত সহিংসতা, মুসলিমদের বাড়িঘর ভাঙচুর এবং মুসলিমদের ওপর পুলিশের বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছি। সহিংসতা এখন আরও পরোক্ষ ও কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। মুসলিম নামধারী শহর, গ্রাম, রাস্তা, এমনকি ভবনের নাম পরিবর্তন এবং সরকারি পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম ইতিহাসের অধ্যায় মুছে ফেলা ও ভারতের নতুন ইতিহাস রচনার মাধ্যমে মুসলিমদের অবদান অস্বীকার করার প্রবণতা সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এছাড়া, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক আখ্যানের মাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো (hate speech) একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি এই বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের বর্ণপ্রথার সবচেয়ে নিচে থাকা দলিতরা উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার। চাকরির বাজারেও দলিতদের প্রতি বৈষম্য প্রবল, যেখানে তাদের অনেক পেশা বা শিল্প থেকে পরিকল্পিতভাবে দূরে রাখা হয়। সংখ্যালঘুদের সাথে সরকারের এই আচরণকে অনেকেই ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরায়েলের নীতি এবং উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের আচরণের সাথে তুলনা করছেন। ইসরায়েলের মতোই ভারত সরকারের বিরুদ্ধেও সংখ্যালঘু দমনে বর্ণবাদতুল্য (apartheid-like) নীতি অনুসরণের অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, কাশ্মীর উপত্যকায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং সামরিক কারফিউ জারি করে জরুরি পরিষেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। একই সাথে, মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর ভারত সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগুলো জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চীনা সরকারের আচরণের সাথে অনেকটা মিলে যায়।বিজেপি সরকার কীভাবে সংখ্যালঘুদের খাঁচায় বন্দি করছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো ডিটেনশন সেন্টারের ব্যবহার, যেখানে এমন ব্যক্তিদের আটকে রাখা হচ্ছে যারা অনিবন্ধিত অভিবাসী বলে সন্দেহভাজন অথবা যারা তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে অক্ষম। এসব বন্দিশালায় থাকা ব্যক্তিদের অধিকাংশই মুসলিম এবং তাদের অনেকেই ২০১৯ সালে পাস হওয়া বিতর্কিত NRC ও CAA-এর শিকার। জাতিসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে প্রায় ২০ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মূলে রয়েছে NRC। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রক্রিয়াটি মুসলিমদের ওপর চরম বৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারীভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।ধর্মনিরপেক্ষ ভারত ও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার স্বরূপ
CAA আইনটিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে। এটি মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থী, যা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। এই আইনের প্রতিবাদে সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে এবং বিক্ষোভকারীরা আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। NRC ও CAA ছাড়াও মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পুলিশের বর্বরতা ও হয়রানির অসংখ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যানুযায়ী, CAA পাস হওয়ার পর থেকে ভারতে অন্তত ১১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী উগ্রবাদীদের দ্বারা মুসলিমদের ওপর হামলা। কোভিড-১৯ মহামারি ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে দিল্লির এক ধর্মীয় জমায়েতে যোগদানের পর মুসলিমদের ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী করা হয়, যা পরবর্তীতে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব ও ঘৃণ্য অপরাধকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো স্বল্প বেতনের চাকরিতে নিয়োজিত দলিতরা মহামারি ও পরবর্তী লকডাউনের কারণে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার ও সরকার সমর্থিত উগ্রবাদীদের দ্বারা হিন্দু ভিন্ন অন্য সম্প্রদায়ের ওপর শত শত হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি, মহারাষ্ট্রে ভীমা কোরেগাঁও যুদ্ধের ২০০তম বার্ষিকী পালনের সময় হাজার হাজার দলিত সমবেত হয়েছিলেন, যেখানে দলিত সৈন্যরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তবে এই স্মরণানুষ্ঠানের বিরোধিতাকারী ডানপন্থি হিন্দু গোষ্ঠীর সঙ্গে দলিত বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই সহিংসতার পর মহারাষ্ট্র পুলিশ দলিত আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল সক্রিয়কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়। সুধা ভরদ্বাজ, ভারভারা রাও ও গৌতম নাভলাখাসহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট অধিকারকর্মীকে সহিংসতায় উসকানি ও মাওবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভারত সরকারের ভিন্নমত দমন ও বাকস্বাধীনতা হরণের চিত্রও ফুটিয়ে তুলেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে, কৃষকদের চলমান আন্দোলনের সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘টুলকিট’ শেয়ার করার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী জলবায়ু কর্মী দিশা রবিকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এই গ্রেপ্তার অধিকারকর্মী ও রাজনীতিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
ভারতে সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং এর সমাধানের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন। ভারত সরকারের জরুরিভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং নিশ্চিত করা উচিত যে, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক যেন মর্যাদা ও সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারে। প্রথমত, একটি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হিসেবে ভারত সরকারের উচিত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি ও দমন-পীড়ন বন্ধ করা। সরকারের এটি অনুধাবন করা জরুরি যে, সংখ্যালঘুরা ভারতীয় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের সাথে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।আরএসএস (RSS) কি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হুমকি?
সরকারের উচিত বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা এবং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে সব পটভূমির মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে। এছাড়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। ভারতের উচিত ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভারত একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে পারবে। এর পাশাপাশি, ভারত সরকারের প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত CAA বাতিল করা এবং NRC প্রক্রিয়া বন্ধ করা, যা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিপন্ন করছে। ডিটেনশন সেন্টারের অমানবিক অবস্থা ও আইনি প্রক্রিয়ার অভাবের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে সমালোচিত, তাই এসব কেন্দ্র বন্ধ করা প্রয়োজন। এর সাথে সাথে সরকার কর্তৃক আন্তঃধর্মীয় সংলাপ উৎসাহিত করা এবং ঘৃণা ছড়ানো ও সহিংসতায় উসকানি দেওয়া বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও শিক্ষার প্রসারে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর উচিত ভারত সরকারকে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় এবং বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য বন্ধে চাপ প্রয়োগ করা। জাতিসংঘ ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভারতের মানবাধিকার রক্ষায় নিয়োজিত স্থানীয় সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীদের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করতে পারে। সাধারণ মানুষের পর্যায়েও তৃণমূলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি সহায়তা ও কল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলোতে দান করা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপে অংশ নেওয়া এবং ঘৃণা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জরুরি।সুদানের গৃহযুদ্ধের এক সহজ বয়ান
পরিশেষে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা সম্ভব, যেখানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।



