দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস
পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের টানাপোড়েন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে সাংস্কৃতিক ফল্ট-লাইন বা ফাটলরেখা অনুধাবন করা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। হান্টিংটন এই গ্রন্থে দাবি করেন যে, স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যুদ্ধ-সংঘাতের মূল অনুঘটক কোনো অর্থনৈতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক মতাদর্শ হবে না; বরং মানুষের আত্মপরিচয়ের শিকড় অর্থাৎ সংস্কৃতি ও ধর্মই হবে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ।
১৯৯৩ সালে মার্কিন জার্নাল ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে ১৯৯৬ সালে সাইমন অ্যান্ড শুস্টার থেকে গ্রন্থটি পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর থেকেই বইটি বিশ্বব্যাপী বহুল পঠিত ও তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয় এবং আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারে পরিণত হয়।
আরো পড়ুনঃ আ ডায়েরি অব আ ইয়ং গার্ল: নাৎসি দখলদারিত্বে টিকে থাকার অনুপ্রেরণাদায়ী আখ্যান
সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের মূল রূপরেখা
হান্টিংটন তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মানবজাতি মূলত কয়েকটি বৃহৎ সভ্যতার বৃত্তে বিভক্ত, যার প্রতিটি নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে লালিত। তিনি বিশ্বকে প্রধানত নয়টি সভ্যতায় ভাগ করেছেন: পশ্চিমা, ল্যাটিন আমেরিকান, আফ্রিকান, ইসলামিক, সিনিক (চীনা), হিন্দু, অর্থোডক্স (রুশ-স্লাভিক), বৌদ্ধ এবং জাপানি সভ্যতা। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটার সাথে সাথে আদর্শিক লড়াইয়ের স্থান দখল করেছে সভ্যতার আত্মপরিচয়।
ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার বিখ্যাত 'ইতিহাসের সমাপ্তি' (The End of History) ধারণার বিপরীতে গিয়ে হান্টিংটন দেখিয়েছেন যে, অ-পশ্চিমা দেশগুলো পশ্চিমা না হয়েও আধুনিক হয়ে উঠছে। আধুনিকায়ন মানেই পশ্চিমা মূল্যবোধ গ্রহণ করা নয়; বরং অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জন করে তারা নিজেদের স্বকীয় সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী হচ্ছে।
জর্জ অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্মের কাহিনী ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে স্বৈরাচার হাসিনার শাসনের গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
পশ্চিম বনাম মুসলিম বিশ্ব
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন হান্টিংটন। তিনি উল্লেখ করেন, সবচেয়ে সংঘাতময় ফাটলরেখাটি অবস্থান করছে পশ্চিমা এবং ইসলামিক সভ্যতার মধ্যবর্তী স্থানে, যার পেছনে কাজ করছে শত শত বছরের ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা, ঔপনিবেশিক আগ্রাসন এবং ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ।
হান্টিংটন যুক্তি দেন যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে পশ্চিমাদের একতরফা সামরিক আগ্রাসন কেবল সংঘাতকেই উসকে দেয়নি, বরং নিজ ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, পশ্চিমা সার্বজনীনতাবাদ (Western Universalism)—অর্থাৎ পশ্চিমা গণতন্ত্র ও ভোগবাদী সমাজব্যবস্থাকে পৃথিবীর একমাত্র আদর্শ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা—অ-পশ্চিমা সভ্যতাগুলোর কাছে নিছক নয়া-সাম্রাজ্যবাদ বলেই প্রতীয়মান হয়।

"পশ্চিমারা নিজেদের ধারণা, মূল্যবোধ কিংবা ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বিশ্ব জয় করেনি; বরং সুসংগঠিত সহিংসতা প্রয়োগের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েই তারা বিশ্বকে পদানত করেছে। পশ্চিমারা প্রায়শই এই সত্য ভুলে যায়; কিন্তু অ-পশ্চিমারা তা কখনো ভোলে না।"
লেখা জমা দিন →মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTEDমেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
— স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন, দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন্স
ইসলামিক সভ্যতাকে জবরদস্তিমূলকভাবে পশ্চিমা রূপ দেওয়ার চেষ্টা না করে হান্টিংটন পরামর্শ দেন যে, পশ্চিমাদের উচিত বহুকেন্দ্রিক বিশ্ববাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং অন্যান্য সভ্যতার অভ্যন্তরীণ স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করা। তাঁর মতে, সামরিক আগ্রাসন পরিহার করে গঠনমূলক সংলাপ ও সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেওয়াই বিশ্বশান্তির একমাত্র উপায়।
চীনের উত্থান এবং বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব
কেবল ইসলাম নয়, হান্টিংটন সিনিক বা চীনা কনফুসীয় সভ্যতার পুনরুত্থানকে পশ্চিমা আধিপত্যের জন্য অন্যতম প্রধান কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর অবধারিতভাবে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে রূপ নেবে, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাবে।
নোয়াম চমস্কি ও ইলান পাপের যৌথ গ্রন্থ 'অন ফিলিস্তিন'-এর সূচনাপর্বে এই সংঘাতের উৎস নিয়ে প্রচলিত আখ্যানের সুনিপুণ ও বিশ্লেষণাত্মক ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
তিনি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন যে, বিশ্বের ভবিষ্যৎ শৃঙ্খলা টিকে থাকবে কেবল তখনই, যখন প্রতিটি সভ্যতার কেন্দ্রীয় শক্তিগুলো (Core States) অন্যের প্রভাব বলয়কে সম্মান জানাবে। বিশ্বজুড়ে পশ্চিমা আধিপত্য বিস্তার করতে গেলে তা অবধারিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।
গ্রন্থটির সীমাবদ্ধতা ও তাত্ত্বিক সমালোচনা
হান্টিংটনের এই বিশদ বিশ্লেষণ সত্ত্বেও তাত্ত্বিক মহলে বইটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এডওয়ার্ড সাঈদের মতো প্রখ্যাত তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, হান্টিংটন পুরো সভ্যতাকে একটি একক, অবিভাজ্য ও কৃত্রিম সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন, যা বাস্তবতাবিবর্জিত। ইসলামিক বিশ্ব কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বহুমাত্রিকতা, বৈচিত্র্য এবং দ্বন্দ্বকে এই তত্ত্বে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাস্তববাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, জাতিরাষ্ট্রগুলোর আচরণ সভ্যতার আবেগের চেয়ে তাদের অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত স্বার্থ দ্বারা বেশি নির্ধারিত হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধ কিংবা আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরায়েলের কৌশলগত বোঝাপড়া প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক নৈকট্যের চেয়ে ভূ-রাজনীতির শক্তিসাম্যই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি।
আরো পড়ুনঃ আমেরিকার কুখ্যাত ব্ল্যাকওয়াটার: কীভাবে তারা বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা ও মূল্যায়ন
প্রকাশের কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও 'দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন্স অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার' আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্রদের জন্য আজও এক অপরিহার্য দলিল। মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে পশ্চিমা আগ্রাসন, রাশিয়ার সাথে ন্যাটোর দ্বন্দ্ব এবং চীন-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতায় হান্টিংটনের সতর্কবার্তাগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। অন্ধ আনুগত্য বা অগ্রাহ্য না করে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বিশ্বরাজনীতির জটিল গতিপ্রকৃতি অনুধাবনের জন্য এই বইটি পাঠ করা প্রতিটি সচেতন পাঠকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আরো পড়ুনঃ স্বৈরতন্ত্র ও মানবাধিকার: স্বাধীনতার দীর্ঘ ঐতিহাসিক লড়াই



