অন প্যালেস্টাইন
ইলান পাপ্পে এবং নোয়াম চমস্কির 'অন প্যালেস্টাইন' কেবল একটি সাধারণ বইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের গভীরে প্রবেশ করে, অবিচারকে উন্মোচিত করে এবং শান্তির প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে। সাক্ষাৎকার, আলোচনা ও বক্তৃতার মধ্য দিয়ে লেখকরা পাঠকদের এই সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবনে সহায়তা করেছেন।
ফিলিস্তিন বিষয়ে নোয়াম চমস্কি
ফিলিস্তিনের ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ
চমস্কি এবং পাপ্পে যুক্তি দেন যে, যদিও সংঘাত নিরসনের একমাত্র পথ হিসেবে 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান'-এর কথা প্রচার করা হয়, প্রকৃতপক্ষে যারা এর প্রবক্তা তারা একটি অসম্ভব বিষয়কেই সমর্থন করছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, দশকের পর দশক ধরে চলা ইসরায়েলি উপনিবেশবাদের ফলে খণ্ডিত ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলো কীভাবে দখলদারিত্বকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। তাঁদের মতে, একটি একক, সম্মিলিত রাষ্ট্রই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে অধিকতর ন্যায়সংগত ও কার্যকর সমাধান।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যুদ্ধের ইতিহাস
অনেকেই এই ধারণার সমালোচনা করেছেন। কারো কারো মতে, অতীতের সংঘাত এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের কারণে একক-রাষ্ট্র সমাধান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। আবার বিশেষ করে ইসরায়েলিরা নিরাপত্তার বিষয় এবং জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে একটি 'ইহুদি রাষ্ট্র' টিকিয়ে রাখার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এই বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে চমস্কি ও পাপ্পে পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরেছেন এবং পাঠকদের একটি ন্যায়সংগত সমাধানের স্বরূপ নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়েছেন।
নোয়াম চমস্কির ‘হু রুলস দ্য ওয়ার্ল্ড?’ বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোর এক বলিষ্ঠ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিশ্লেষণ। গ্রন্থটি প্রচলিত বয়ানগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নাগরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধির আবশ্যিকতার ওপর আলোকপাত করে।
চমস্কির 'অন প্যালেস্টাইন'-এ ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, রামাল্লাহর একজন তরুণ আন্দোলনকারী বলেন, "আমরা প্রতিদিন এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকি। একটি রাষ্ট্র, যার ভবিষ্যৎ হবে সবার জন্য অংশীদারিত্বের, তা হয়তো আমাদের জাতিকে বিভাজন ও অবিচারের বৃত্ত থেকে মুক্ত করতে পারবে।" এই বয়ানগুলো লেখকদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সংঘাতময় জীবনে বসবাসরত মানুষের বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত করে।
লেখকরা এই সংঘাতে আমেরিকার ভূমিকাও খতিয়ে দেখেছেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অটল সমর্থন ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের পথকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই পরিস্থিতি অন্যান্য সেসব ঘটনার সমান্তরাল, যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি স্থানীয় অধিকারের চেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। সংঘাতকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার ফলে, চমস্কি ও পাপ্পে এটিকে ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য চলমান বিশ্বব্যাপী সংগ্রামের সাথে একীভূত করেছেন।
এক রূঢ় বাস্তবের উন্মোচন
ইলান পাপ্পে এবং নোয়াম চমস্কির 'অন প্যালেস্টাইন' ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা ট্র্যাজেডির একটি সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট এবং গভীর বিশ্লেষণ। লেখকরা মূলত গাজায় চলমান অবরোধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে যুদ্ধের প্রভাবের ওপর আলোকপাত করেছেন।
গ্রীষ্মের সময়গুলোতে পরিবারগুলোকে চেকপয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়; ক্লান্তি ও উদ্বেগের মাঝে শিশুরা ধ্বংসস্তূপের ওপর খেলা করে। প্রাপ্ত একমাত্র পানি নোনা, যা পানির সংকটের কথা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়। দখলদারিত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিরা খাদ্য ও পানির অভাব এবং তীব্র মানসিক চাপের শিকার। হেবরনের এক বাবা আহমদ বলেন, "আমি আমার সন্তানদের এমন এক বিশ্বে বড় হতে দেখছি, যেখানে স্বপ্নগুলো চেকপয়েন্ট ও দেয়ালের জিম্মি। কিন্তু আমরা একে অপরের টিকে থাকার লড়াই থেকে শক্তি খুঁজে নিই।" তাঁর এই কথাগুলো একদিকে যেমন দৈনন্দিন সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে, তেমনি মানুষের অটল আশাকেও প্রকাশ করে।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
চমস্কি ও পাপ্পে সযত্নে ইসরায়েলের কৃত যুদ্ধাপরাধের দলিল তুলে ধরেছেন, যা পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। তাঁরা পাঠকদের মূলধারার বয়ান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে এবং সংঘাতের অন্যান্য দৃষ্টিকোণ খুঁজে দেখতে উৎসাহিত করেন।
হতাশার মাঝেও আশা
পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হওয়া সত্ত্বেও, চমস্কি ও পাপ্পে আশাবাদী। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের দৃঢ়তা এবং তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি, ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ ও ন্যায়সংগত সমাধানে সমর্থনের লক্ষ্যে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংহতি আন্দোলনের প্রশংসাও করেছেন তাঁরা।
একটি চ্যালেঞ্জিং অথচ সমৃদ্ধ পাঠ
'অন প্যালেস্টাইন' একটি চিন্তাশীল পাঠ। এটি পাঠকদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সাক্ষাৎকার, প্রবন্ধ ও বক্তৃতার মাধ্যমে এটি সংঘাতের বহুমুখী দিক বুঝতে সাহায্য করে। বইটি পাঠকদের নিজস্ব স্বাধীন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে এবং ফিলিস্তিনের শান্তি ও ন্যায়ের সক্রিয় সমর্থক হতে আহ্বান জানায়।
জর্জ অরওয়েলের অ্যানিম্যাল ফার্মের কাহিনী ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে স্বৈরাচার হাসিনার শাসনের গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এই বইটি পড়ার সময় এর গল্প ও ধারণার আলোকে ভাবুন, আপনি কীভাবে ন্যায়বিচারের আন্দোলনে শামিল হতে পারেন। মানুষ যত বেশি জানবে, ততই তারা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে। এই বইটি আপনাকে পরিবর্তন ও অ্যাডভোকেসির পথে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
বইয়ের বাইরেও
নোয়াম চমস্কির 'অন প্যালেস্টাইন'-এর প্রভাব কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি পাঠকদের ফিলিস্তিনি মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে। স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয়তা, বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তা অথবা জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে প্রত্যেকেই একটি ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে কাজ করতে পারেন।
আপনি বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট, স্যাংশনস (BDS) আন্দোলনের মতো উদ্যোগগুলোতে সমর্থন দিয়ে শুরু করতে পারেন, যা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানায়। এছাড়া ফিলিস্তিনি শিশুদের শিক্ষার জন্য প্রচারণা কিংবা 'জুয়িশ ভয়েস ফর পিস'-এর মতো সংগঠনের আয়োজনে অংশ নিয়ে সংলাপ ও শান্তির বার্তা প্রচার করতে পারেন।
সংঘাত বিষয়ক আলোচনা বা কর্মশালার মতো শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ গভীরতর বোঝাপড়া এবং ন্যায়ের প্রতি সমর্থন তৈরি করতে পারে। সরকারি প্রতিনিধিদের কাছে আপনার উদ্বেগের কথা জানানোও কার্যকর হতে পারে। এছাড়া ফিলিস্তিনি জনপদগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
উপসংহার
ইলান পাপ্পে ও নোয়াম চমস্কির 'অন প্যালেস্টাইন' বইটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী যে কারো জন্য অপরিহার্য পাঠ্য। এটি নিপীড়নের মুখে মানুষের অজেয় চেতনার এক শক্তিশালী দলিল এবং যারা এমন এক বিশ্বে বিশ্বাসী যেখানে শান্তি ও ন্যায়বিচার বিরাজমান, তাদের জন্য এটি একটি দিকনির্দেশক। সংঘাতের বাস্তবতা উন্মোচন এবং স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে চমস্কি ও পাপ্পে উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন, যা ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি—উভয় পক্ষের জন্যই এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে পারে।



