ওপেনএআই-এর উদ্ভাবিত চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) এমন একটি জেনারেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যা মানুষের স্বাভাবিক বাচনভঙ্গির অনুরূপ প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিনির্ভর টেক্সট বা লেখা তৈরিতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। পারস্পরিক কথোপকথন এবং দীর্ঘ দলিলের সারসংক্ষেপ তৈরি থেকে শুরু করে বহুভাষিক অনুবাদ পর্যন্ত নানাবিধ কাজে এটি অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। কর্মসংস্থানের ঝুঁকি প্রসঙ্গে মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, চ্যাটজিপিটি মূলত মানুষের কাজের সহায়ক একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রযুক্তি; এটি মানুষের সম্পূর্ণ বিকল্প কোনো অস্তিত্ব নয়। যদিও এটি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করতে পারে, তথাপি মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধি ও সৃজনশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প হওয়া এর পক্ষে সম্ভব নয়। অধিকন্তু, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং সংশ্লিষ্ট শিল্পে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে।
ইলিয়া সুৎস্কেভার, গ্রেগ ব্রকম্যান, ভয়চেক জারেম্বা এবং স্যাম অল্টম্যান প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই তৈরি করেছে চ্যাটজিপিটি (জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার)। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত শত কোটি বাক্যের বিশাল ডেটাসেট ব্যবহার করে একদল দক্ষ গবেষক ও প্রকৌশলী এই মডেলটিকে প্রশিক্ষণ দেন। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি শক্তিশালী ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল উদ্ভাবন করা, যা স্বাভাবিক ভাষা অনুধাবন করতে পারে এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণের (NLP) বিভিন্ন জটিল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। ২০১৮ সালে একটি গবেষণাপত্রের মাধ্যমে এটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে এবং ধারাবাহিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
চ্যাটজিপিটিতে কাদের বিনিয়োগ রয়েছে?
চ্যাটজিপিটি তৈরি ও প্রশিক্ষণে সর্বমোট কত অর্থ ব্যয় হয়েছে কিংবা কারা এতে প্রত্যক্ষ অর্থায়ন করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। একটি বৃহৎ গবেষণা প্রকল্প হিসেবে এর যাবতীয় ব্যয়ভার ওপেনএআই-এর বিনিয়োগকারীদের তহবিল থেকেই নির্বাহ করা হয়েছে। ওপেনএআই একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর গবেষণার সঠিক বাজেট জনসমক্ষে উন্মুক্ত নয়।
তবে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যান, গ্রেগ ব্রকম্যান, ইলিয়া সুৎস্কেভার এবং ভয়চেক জারেম্বা ছাড়াও আন্দ্রেসেন হোরোভিটজ, ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস এবং অবিয়াস ভেঞ্চারসের মতো শীর্ষস্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো এতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
বড় মাপের ভেঞ্চার ফান্ডের পাশাপাশি অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (AWS), ইনফোসিস এবং ওয়াই কম্বিনেটরের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ওপেনএআই-কে কৌশলগত সহায়তা জুগিয়েছে। লিঙ্কডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান এবং পেপ্যালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েলও এই সংস্থায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগ করেছেন।
আমেরিকান মিডিয়া সত্যকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরণের "ফিল্টার" ব্যবহার করে। তারা জাতিগত পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে অপরাধীদের আলাদা পরিচয় দেয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিনিয়োগ এসেছে মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মাইক্রোসফট ওপেনএআই-এর গবেষণায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল জেনারেল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AGI) বিকাশকে ত্বরান্বিত করা। ওপেনএআই-এর প্রযুক্তি মাইক্রোসফট অ্যাজিউর ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মাইক্রোসফট তাদের পণ্য ও সেবার গুণগত রূপান্তর ঘটায়, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

উল্লেখ্য যে, এই সংখ্যাগুলো শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত বিনিয়োগের খতিয়ান; এর বাইরেও বহু অভ্যন্তরীণ আর্থিক অংশীদারিত্ব রয়েছে যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
চ্যাটজিপিটি কী কী সেবা প্রদান করে?
প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণের বিপুলসংখ্যক কাজ অনায়াসে সম্পাদন করতে পারে চ্যাটজিপিটি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
কনটেন্ট ও টেক্সট রচনা: মানুষের বাচনভঙ্গির অনুরূপ নিবন্ধ, সৃজনশীল গল্প কিংবা সংলাপ তৈরি করা, যা কনটেন্ট তৈরি ও চ্যাটবট পরিচালনায় কার্যকর।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
ভাষাগত অনুবাদ: জিরো-শট লার্নিং পদ্ধতির সাহায্যে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় নির্ভুল ও প্রাঞ্জল অনুবাদ প্রস্তুত করা।
নথিপত্রের সারাংশ তৈরি: বিশালাকার গবেষণা নিবন্ধ, সংবাদ প্রতিবেদন বা আইনি দলিলের মূল নির্যাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরা।
প্রাসঙ্গিক প্রশ্নোত্তর: ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তথ্যভিত্তিক নিখুঁত উত্তর প্রদান করা।
অনুভূতির বিশ্লেষণ (Sentiment Analysis): সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এবং গ্রাহকদের মতামত বিশ্লেষণ করে ইতিবাচক বা নেতিবাচক মনোভাব শনাক্ত করা।
কর্মক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অর্জিত গড় আয়ের যে ব্যবধান, তাকেই মূলত লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্য হিসেবে অভিহিত করা হয়।
পাঠ্য শ্রেণিবিন্যাস (Text Categorization): স্প্যাম বার্তা চিহ্নিতকরণ এবং বিষয়ের ভিত্তিতে টেক্সট পৃথকীকরণ।
কোড রচনা ও সমাপ্তিকরণ: প্রোগ্রামারদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোড লিখে দেওয়া এবং জটিল সফটওয়্যারের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা।
আরো পড়ুনঃ এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পৃথিবী কতটা সফল হলো?
চ্যাটজিপিটি নিয়ে কি আমাদের আতঙ্কিত হওয়া প্রয়োজন?
যেহেতু চ্যাটজিপিটি মানুষের কাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সহায়তা করার একটি প্রযুক্তি, তাই এটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এটি যত দক্ষ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলই হোক না কেন, মানুষের নিজস্ব চেতনা, আত্মোপলব্ধি এবং নৈতিক বিচারবুদ্ধির জায়গা এটি কখনো দখল করতে পারবে না। চ্যাটজিপিটির ফলাফল শেষ পর্যন্ত মানুষের দেওয়া ডেটা, অ্যালগরিদম এবং দিকনির্দেশনার ওপরই একান্তভাবে নির্ভরশীল।
এটি সত্য যে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে শ্রমবাজারে কিছু রূপান্তর ঘটবে এবং করণিক পুনরাবৃত্তিমূলক কিছু কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি শিল্পবিপ্লবের মতোই, এ জাতীয় প্রযুক্তি মানুষকে কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তিকে প্রতিযোগী না ভেবে মানুষের সৃজনশীল শক্তির সহযাত্রী হিসেবে গ্রহণ করাই সমীচীন।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, চ্যাটজিপিটি গুগলের সরাসরি বিকল্প নয়; বরং ভাষা প্রক্রিয়াকরণের একটি আধুনিক প্ল্যাটফর্ম। তবে প্রথাগত সার্চ ইঞ্জিনের একচেটিয়া রাজত্বে এটি যে একটি শক্তিশালী ধাক্কা দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং আতঙ্কিত হওয়ার কিছু থাকলে তা হয়তো প্রথাগত টেক জায়ান্টদের জন্য, সাধারণ মানুষের মেধার জন্য নয়।




