কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে আসছে?
রক্তস্নাত এক বন্ধন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রায়শই ‘অভেদ্য’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এটি এমন এক অংশীদারিত্ব যা কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তনের মুখেও টিকে আছে। কিন্তু কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়? এর কারণগুলো কী কী? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের সেই ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণগুলো পরীক্ষা করতে হবে যা এই মৈত্রী গড়ে তুলেছে।ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত: একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা
ঐতিহাসিক ভিত্তি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং হলোকাস্ট
১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানের হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল বিশ্বব্যাপী এক সংঘাত, যেখানে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো মিত্র ও অক্ষ—এই দুই শিবিরে বিভক্ত ছিল। মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন; অন্যদিকে অক্ষশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল জার্মানি, ইতালি ও জাপান। মিত্রশক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করা, যারা ইউরোপের অধিকাংশ দখল করে নিয়েছিল এবং লক্ষ লক্ষ ইহুদি ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করছিল। নাৎসি শাসন ‘ফাইনাল সলিউশন’ বা চূড়ান্ত সমাধান নামে একটি পদ্ধতিগত গণহত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল ইউরোপের সকল ইহুদিকে নিশ্চিহ্ন করা। নাৎসিরা ইহুদিদের ‘নোংরা ইঁদুর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং তাদের নৃশংসতা চালানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল, যেমন—গণগুলি, ঘেটো, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এবং ডেথ ক্যাম্প; ঠিক যেমনটি বর্তমান ইসরায়েলি সরকার দখলকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের সাথে করছে। জাপানের ওপর ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট বয়’ নামক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপে ব্যস্ত থাকাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হলোকাস্টের ভয়াবহতার পূর্ণ মাত্রা সম্পর্কে অবগত ছিল না। যে মার্কিন সৈন্য ও সাংবাদিকরা জাপান ও ভিয়েতনামে গণহত্যা চালিয়েছিল, তারা নাৎসিদের অত্যাচারের সাক্ষী ছিল। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ছবি ও জবানবন্দি আমেরিকান মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়, যা আমেরিকান জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সহানুভূতির জন্ম দেয়। আমেরিকান নীতিনির্ধারকরা এই গণহত্যার সম্ভাবনাকে কাজে লাগায় এবং মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তৎকালীন ইহুদিদের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে।ট্রুম্যানের স্বীকৃতি
১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার পর ইউরোপ থেকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে অভিবাসী হওয়া শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিনে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটেন ঘোষণা করে যে তারা ফিলিস্তিন থেকে সরে যাবে। ফিলিস্তিন ছিল মধ্যপ্রাচ্যের একটি অঞ্চল যেখানে মুসলিম ও অল্প সংখ্যক ইহুদি বসবাস করত। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ একটি বিভাজন পরিকল্পনা প্রস্তাব করে, যা ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা ছিল: একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি মুসলিমদের জন্য। ইহুদিরা এই পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও আরবরা তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে, ফিলিস্তিনের ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়ন ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এই অবৈধ প্রতিষ্ঠার প্রতিক্রিয়া বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো এই অবৈধ স্থাপনা ও বসতি স্থাপনকারীদের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত ছিল। তবে নতুন এই স্থাপনাটি প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যানের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পায়, যিনি স্বাধীনতার ঘোষণার মাত্র ১১ মিনিট পরেই ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি নৃশংসতার পেছনের কারণসমূহ
গত ১৩ মে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের রিয়াদে এক বিনিয়োগ সম্মেলনে সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন।
অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারিত্বের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, তবে এর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের তথাকথিত “অংশীদারিত্বমূলক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ”। তত্ত্বগতভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যারা স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বহুত্ববাদের নীতি সমুন্নত রাখে। যদিও এই মূল্যবোধগুলো তাদের সংবিধানে খোদাই করা, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সুশীল সমাজ বা সংস্কৃতিতে তার কোনো প্রতিফলন নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া নিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া রয়েছে এবং তারা অভিন্ন স্বার্থে একে অপরকে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করে। গাজা, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমরা এই তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।আমেরিকার ব্ল্যাকওয়াটার কী? কীভাবে তারা বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে?
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
কৌশলগত স্বার্থ
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কেবল এই শতাব্দীতে নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভব বা ফিলিস্তিনে ইসরায়েল নামক স্থাপনা তৈরির অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলটি গুরুত্বের কেন্দ্রে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের অধিকাংশ তেল মজুদ রয়েছে এবং এটি পশ্চিমা আধিপত্যের সংঘাতের হটস্পট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই অঞ্চলে একটি নির্ভরযোগ্য মিত্র ও শক্তির উৎস হিসেবে দেখে, যা সেখানে আমেরিকার স্বার্থ বজায় রাখে। এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলি স্থাপনার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যাতে ইরান, সিরিয়া, হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া মোকাবেলা করা যায়। ইসরায়েলকে সমর্থন করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব, জর্ডান ও মিশরের মতো অন্যান্য মিত্রদেরও রক্ষা করতে চায়। অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে যে ইসরায়েলের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রেখে তারা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের এমন একটি পক্ষপাতমূলক, অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অবাস্তব ও অনৈতিক সমাধান (যেমন: আব্রাহাম অ্যাকর্ডস) চাপিয়ে দিতে পারবে, যা আদতে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিই বাড়াবে।সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহযোগিতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়, তার আরেকটি কারণ হলো তাদের দ্বারা তৈরি ভুক্তভোগীদের দমনের অভিন্ন স্বার্থ। ইসরায়েল দখলদার বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিজেদের মাতৃভূমি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইরত আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং পশ্চিম তীরের ইসলামিক জিহাদ—আক্রমণ করে থাকে। যখন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক সামরিক স্থাপনা হিসেবে দখলদার ইসরায়েল বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালায়, তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে এবং শান্তিতে বেঁচে থাকা ও মানবাধিকার ভোগের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ১২-২০ কিমি রেঞ্জের সাধারণ রকেট দিয়ে পাল্টা আঘাত করে। এটি ইসরায়েলি বসতি এবং ঐ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ ও কর্মীদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং শত শত বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সক্ষমতা এই ভয় দূর করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান প্রমাণিত হয়েছে।হামাস কী? ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামের দলের সহজ পরিচিতি
জাতীয়তাবাদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এর উৎপত্তি মূলত মধ্যযুগের শেষদিকে রেনেসাঁ যুগে। পরবর্তীতে আধুনিক যুগের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে যুক্ত হয়ে একটি বিস্তৃত ধারণায় পরিণত হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের প্রাপ্যতা
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে সমর্থনের তৃতীয় কারণটি হলো গোয়েন্দা তথ্যের সহজলভ্যতা। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বের সেরা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম, যাদের মানবসম্পদ, সিগন্যাল ইন্টারসেপ্ট, স্যাটেলাইট ইমেজের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও সাইবার অপারেশন রয়েছে। ইসরায়েলের সাথে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় তাদের কৌশলগত সহযোগিতার মূল ভিত্তি, যা উভয় দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দূতাবাস, সামরিক ঘাঁটি এবং এয়ারলাইন্সে আসন্ন হামলার ব্যাপারে সতর্ক করেছে। এছাড়া ইরান, সিরিয়া, রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিপক্ষের অভিপ্রায় ও সক্ষমতা সম্পর্কেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য দিয়ে আসছে। অধিকন্তু, ইসরায়েল ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা এবং ইরানি সেন্ট্রিফিউজগুলো অকেজো করার মতো অভিন্ন শত্রুদের বিরুদ্ধে গোপন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছে।অর্থনৈতিক সম্পর্ক
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা ১৯৮৫ সাল থেকে শুরু হয় যখন তারা একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে—যা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রথম। তারপর থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০১৯ সালে ৪৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের রপ্তানির ২৭% এবং আমদানির ১৩% অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের একটি প্রধান গন্তব্যস্থল, যেখানে ২০১৯ সালে ৩৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনেক মার্কিন-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যেমন—এয়ারবিএনবি (Airbnb), বুকিং ডটকম (booking.com) এবং এক্সপিডিয়া (Expedia), অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের দখলকৃত ভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপনের জন্য দায়ী।ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের ওপর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রভাব
উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মৈত্রীর আরেকটি ভিত্তি হলো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে তাদের অভিন্ন স্বার্থ। ইসরায়েল সাইবার নিরাপত্তা, জৈবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা হিসেবে স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের গবেষণা, উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম থেকে উপকৃত হয়। দুই দেশ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রকল্পে সহযোগিতা করে, যেমন—‘বাই-ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ (BIRD), যা মার্কিন ও ইসরায়েলি কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগে অর্থায়ন করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে, যা তাদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে গুণগত মান বজায় রাখতে সাহায্য করে।লবিং ও জনসমর্থন
ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নির্ধারণের অন্যতম শক্তিশালী শক্তি হলো ইসরায়েলপন্থী লবি—এটি মূলত ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠন ও ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্ক। এই গ্রুপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী হলো ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (AIPAC), যাকে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ইসরায়েলের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক নির্ধারণকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছে। AIPAC ও অন্যান্য ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী কংগ্রেস ও নির্বাহী শাখায় লবিং করে যাতে ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়া যায়, সমালোচনাকে প্রভাবিত বা মোকাবেলা করা যায় এবং অঞ্চলে ইসরায়েলি নীতিকে সমর্থন করা যায়। তারা মিডিয়া ক্যাম্পেইন, শিক্ষা কর্মসূচি ও তৃণমূল পর্যায়ের সক্রিয়তার মাধ্যমে ইসরায়েলের পক্ষে জনমত গঠন করে।দ্বিদলীয় সমর্থন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলকে সমর্থন করে তার আরেকটি কারণ হলো, মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি দ্বি-দলীয় সমর্থন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয়ই ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও তাদের নৃশংসতার দায়মুক্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে, যা মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এক বিরল ঐকমত্যের বিষয়। এই দ্বি-দলীয় সমর্থন বিভিন্ন কারণ থেকে উদ্ভূত, যেমন—অভিন্ন মূল্যবোধ, কৌশলগত স্বার্থ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ। অনেক আমেরিকান রাজনীতিক ইসরায়েলকে একটি অস্থির গণতান্ত্রিক অঞ্চল হিসেবে দেখেন, যারা তাদের তৈরি করা সংঘাত দমনে অংশীদার, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির উৎস এবং বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের মাধ্যম। তারা এও বোঝেন যে, ইসরায়েলকে সমর্থন দিলে তারা ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ও ইহুদি আমেরিকানদের মতো নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীর ভোট পেতে সক্ষম হবেন।ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনা
ইরানের হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র কেন ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় তার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি স্থাপনা যৌথভাবে ইরানের কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করেছে, তবুও তারা ইরানকে এমন একটি পক্ষ হিসেবে দেখে যা তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজেদের রক্ষা ও ইরানকে কোণঠাসা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন—নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সাইবার আক্রমণ এবং ইরানি বিজ্ঞানী ও জেনারেলদের হত্যাকাণ্ড। এছাড়া সম্ভাব্য ইরানি হামলা প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করেছে।ইসরায়েলের অত্যাচার: ফিলিস্তিন দখলের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
ফিলিস্তিন সংঘাত
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল সমর্থনের পেছনে আরেকটি কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা। ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধানের নামে যুক্তরাষ্ট্র আসলে এই সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে এই প্রচেষ্টায় একটি অপরিহার্য অংশীদার মনে করে। এছাড়া তারা অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাপ দিয়েছে। ২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ডস প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু এটি ছিল একটি পক্ষপাতমূলক ও অবাস্তব সমাধান, যা বাস্তবে রূপ পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।সামরিক সহায়তা ও সহযোগিতা
সামরিক সহায়তা
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল সমর্থনের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো বার্ষিক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা। এই সহায়তা ইসরায়েলকে অঞ্চলে তাদের গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে এবং তাদের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সাহায্য করে।সামরিক সহযোগিতা
মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অংশীদারিত্বের আরেকটি মাত্রা হলো উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তির যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন। উভয় দেশই তাদের দক্ষতা ও উদ্ভাবন শেয়ার করার মাধ্যমে উপকৃত হয় এবং একে অপরের বাজার ও সম্পদের সুবিধা পায়। সফল যৌথ প্রকল্পের কিছু উদাহরণ হলো—‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ‘অ্যারো’ অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম এবং এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান। এই প্রকল্পগুলো উভয় দেশের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বার্থকে বৃদ্ধি করে।ইসরায়েলের সহিংসতাকে তার সঠিক নামেই ডাকা যাক: সন্ত্রাস, সংঘাত নয়




