হামাস কী?
‘হামাস’ একটি আরবি শব্দ যার অর্থ "উদ্দীপনা"; এটি মূলত ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ বা ‘ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আশির দশকের শেষভাগ থেকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অন্যতম প্রধান নিয়ামক এই সুন্নি ইসলামপন্থী ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী সংগঠনটি। হামাস গাজা উপত্যকায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখে, যা প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার (১৪১ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং যেখানে বিশ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। তবে এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, গাজা উপত্যকা আজও ইসরায়েলি অবরোধের অধীনে রয়েছে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের ওপর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রভাব
আব্রাহাম চুক্তি হলো ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন সহ আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য একাধিক চুক্তির সমষ্টি।
হামাসের উৎপত্তি ও ইতিহাস
হামাসের শেকড় ১৯২৮ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত সুন্নি ইসলামপন্থী সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে যুক্ত। শরিয়া আইনের ওপর ভিত্তি করে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাই মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক মূলভিত্তি। ষাট ও সত্তরের দশকে সংগঠনটি গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। ১৯৮৭ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের আলেম শেখ আহমেদ ইয়াসিন হামাস প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সাফল্য ইয়াসিনকে অনুপ্রাণিত করেছিল, যা ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল। দ্রুতই হামাস ফিলিস্তিনিদের মাঝে, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় এক জনপ্রিয় শক্তিতে পরিণত হয়। হামাসের প্রাথমিক আদর্শিক ভিত্তিগুলো ১৯৮৮ সালের সনদে বর্ণিত হয়েছে। পিএলও (PLO)-এর বিপরীতে, হামাস ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় না। উক্ত সনদে ইসরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংসের ডাক দেওয়া হয়েছে এবং ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ডে ইসলামি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই সনদ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দ্বিজাতি তত্ত্ব বা ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর সম্ভাবনাকেও প্রত্যাখ্যান করে। তবে, হামাস ১৯৬৭ সালের সীমানার মধ্যে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে সমর্থন জানায়। ২০১৭ সালে ফিলিস্তিনি এই গোষ্ঠীর নির্বাসিত নেতা খালেদ মেশাল বলেছিলেন, "বর্তমান চাপ বা দখলদারিত্বের মেয়াদ যতই দীর্ঘ হোক না কেন, আমরা আমাদের ফিলিস্তিনি স্বদেশের এক ইঞ্চি জমিও ত্যাগ করব না।"ইসরায়েলের ওপর হামাসের আক্রমণের ঘটনাপ্রবাহ
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
হামাসের রাজনৈতিক শাখা
হামাস তার রাজনৈতিক শাখার মাধ্যমে গাজা উপত্যকা পরিচালনা করে। ইসমাইল হানিয়াহ, যিনি গাজার কার্যত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি এই শাখার নেতৃত্বে রয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য হামাসের একটি সামরিক শাখাও রয়েছে। বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক জটিলতায় ভরা। ২০০৭ সালে ফাতাহর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধের পর হামাস গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ লাভ করে, অন্যদিকে পশ্চিম তীরের কর্তৃত্ব ফাতাহর হাতে থেকে যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে হামাসের যোগাযোগ প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরও কয়েকটি দেশ এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। একই সাথে, ইরান ও কাতারের মতো দেশগুলোর সঙ্গে হামাসের কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও, হামাস গাজার বাসিন্দাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি প্রদান করে। এছাড়া, ইসরায়েলি আক্রমণ থেকে গাজাকে রক্ষা করার জন্য হামাস সুড়ঙ্গ ও বাঙ্কারের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে।ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস: আপনার যা জানা প্রয়োজন
পশ্চিমা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড দেখলে মনে হয়, গাজায় কোনো মানুষ নিহত হয় না—শুধু "হামাস মেম্বার" হয়! আর ইউক্রেনের গমের ক্ষেত ধ্বংস হলে "হিউম্যানিটি ক্রাইম" হয় ।
হামাসের সামরিক শাখা
হামাসের সামরিক শাখার নাম ইজ্জ আদ-দিন আল-কাসাম ব্রিগেড। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের দায়িত্ব এই বাহিনীর ওপর ন্যস্ত। তাদের কাছে রয়েছে বিপুল পরিমাণ রকেটের ভাণ্ডার, যা তারা নিয়মিত ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য তারা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের একটি বিস্তৃত জাল ব্যবহার করে। হামাসের সামরিক কৌশল মূলত ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ (Asymmetric warfare)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি এমন এক যুদ্ধের ধরন যেখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ শক্তিশালী শত্রুকে পরাস্ত করতে অপ্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করে। রকেট ও সুড়ঙ্গের ব্যবহার এই কৌশলেরই উদাহরণ। হামাসের সামরিক তৎপরতা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাদের রকেট হামলায় ইসরায়েলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আবার ইসরায়েলি সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জন্যও তারা সুড়ঙ্গপথকে ব্যবহার করে।হামাস ও সামাজিক উন্নয়ন
হামাস তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শাসন পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সেবা প্রদান করে। তারা বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। গাজা উপত্যকায় নিরাপত্তা সেবা দেওয়ার দায়িত্বও তাদের। গাজার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে হামাস নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইসরায়েল ও মিশরের আরোপ করা অবরোধের কারণে গাজার অর্থনীতি বিপর্যস্ত, যার ফলে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার অত্যন্ত বেশি।ইসরায়েলের সহিংসতাকে সহিংসতা নয়, সন্ত্রাস হিসেবেই চিহ্নিত করা হোক
এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, হামাস গাজার জনগণের জন্য কিছু মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে, তাদের দেওয়া সেবার মান প্রায়শই নিম্নমানের হয়। এছাড়া, গাজা শাসনে হামাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে।পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামাস তাদের দলীয় নথিপত্র ও সনদে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ২০১৭ সালের নতুন রাজনৈতিক দলিলে ‘টু-স্টেট সলিউশন’ বা দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রশ্নে তারা নমনীয়তা দেখায়। সেই দলিলে ইহুদি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিষয়টিও স্বীকার করা হয়। এটি ছিল হামাসের আগের অবস্থানের চেয়ে বড় ধরনের বিচ্যুতি, কারণ আগে তারা দ্বিজাতি তত্ত্বকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করত। হামাসের এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন একটি বড় কারণ। হামাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। এছাড়া গাজার বাসিন্দারাও উন্নত জীবনযাত্রার দাবিতে হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। হামাসের এই অবস্থান পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় গ্রহণ করেছে। কেউ কেউ এটিকে শান্তির আলোচনায় আগ্রহের লক্ষণ হিসেবে দেখছে, আবার কেউ কেউ একে কেবল কৌশলগত পদক্ষেপ বলে মনে করছে, যাদের মতে দলটি এখনও ইসরায়েল ধ্বংসের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি।হামাস ও ফাতাহ: দল দুটির পার্থক্য কোথায়?
ফিলিস্তিনের প্রধান দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী হলো হামাস ও ফাতাহ। এদের আদর্শ, রাজনৈতিক কৌশল ও সামাজিক ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা। হামাস হলো একটি সুন্নি ইসলামপন্থী ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। তাদের আদর্শ সুন্নি ইসলাম ও ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণে গঠিত। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত পুরো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য।ইসরায়েলের স্বৈরাচার: ফিলিস্তিন দখলদারিত্বে পশ্চিমা সমর্থনের একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
অন্যদিকে, ফাতাহ একটি ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। তাদের আদর্শ অনুযায়ী, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনই তাদের লক্ষ্য। ফাতাহ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সমাধান হিসেবে দ্বিজাতি তত্ত্ব গ্রহণ করতে রাজি এবং তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। দুই দলের রাজনৈতিক কৌশলও ভিন্ন। হামাস একটি উগ্রবাদী সংগঠন যারা লক্ষ্য অর্জনে বলপ্রয়োগ করে। ফাতাহ একটি মূলধারার রাজনৈতিক দল যারা ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। তাদের সামাজিক ভিত্তিও আলাদা। হামাস গাজার নিম্নবিত্ত মানুষের মাঝে বেশি জনপ্রিয়, অন্যদিকে ফাতাহর গ্রহণযোগ্যতা ফিলিস্তিনি মধ্যবিত্ত ও প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেশি।সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ: গাজা সংঘাত
২০২৩ সালের শুরুর দিকে ইসরায়েল ও হামাস একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গাজায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার জেরে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, যার জবাবে হামাস রকেট হামলা চালায়। ১০ দিনব্যাপী এই যুদ্ধে প্রায় ১,০০০ মানুষ প্রাণ হারান, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ফিলিস্তিনি। এরপর ২০২৩ সালের অক্টোবরে এক বিস্ময়কর ঘটনায়, হামাস ইসরায়েলের ওপর এক দুঃসাহসী ও বহুমুখী আক্রমণ চালায়। এই হামলায় নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে অনুপ্রবেশ এবং গাজা থেকে অবিরাম রকেট বর্ষণসহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। এই আক্রমণের সময়টি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, যা ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ‘সিমচাত তোরাহ’-এর সাথে মিলে যায়।




