বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭)
১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের রূপরেখা নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি ছিল ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর কর্তৃক ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট সদস্য লিওনেল ওয়াল্টার রথচাইল্ডের কাছে পাঠানো একটি চিঠি। এই চিঠিতে উল্লেখ ছিল যে, তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনাধীন এবং ফিলিস্তিনি আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগণের জন্য একটি "জাতীয় আবাসভূমি" (national home) প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানায়। চিঠিতে আরও শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, ফিলিস্তিনে বসবাসরত অ-ইহুদি সম্প্রদায় কিংবা অন্য দেশে বসবাসরত ইহুদিদের অধিকারের যেন কোনো হানি না ঘটে। ১৯১৭ সালের ৯ নভেম্বর সংবাদমাধ্যমে বেলফোর ঘোষণা প্রকাশিত হয়। বেলফোর ঘোষণার প্রতি বিভিন্ন পক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্নমুখী। জায়নবাদীরা একে তাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি এবং তাদের আন্দোলনের জন্য উৎসাহ হিসেবে স্বাগত জানায়। তারা এটিকে যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনের সহায়তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখেছিল। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি আরবরা একে তাদের অধিকার ও স্বার্থের পরিপন্থী বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। তাদের অভিমত ছিল, তাদের সম্মতি ব্যতিরেকে অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর হাতে তাদের ভূমি তুলে দেওয়ার অধিকার ব্রিটেনের নেই। তারা আরও আশঙ্কা করেছিল যে, বিপুল সংখ্যক ইহুদি অভিবাসীর আগমন ফিলিস্তিনে তাদের জনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলবে। আরব নেতারা, যারা অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন, তারা মনে করেছিলেন যে ব্রিটেন তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার পরামর্শ করেনি বা তাদের সম্মান প্রদর্শন করেনি। তারা দাবি জানান, যেন ব্রিটেন এই অঞ্চলে আরব স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে তাদের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। এছাড়াও, কিছু ইহুদিবিরোধী (anti-Zionist) ইহুদি বেলফোর ঘোষণার সমালোচনা করেন; তাদের যুক্তি ছিল, এটি নিজ নিজ দেশে ইহুদিদের আত্মীকরণ ও সংহতির নীতির লঙ্ঘন। তারা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এটি বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ ও শত্রুতা বৃদ্ধি করবে।ইসরায়েলে হামাসের হামলার ঘটনাপ্রবাহ
বেলফোর ঘোষণা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এটি ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, যা ইহুদি ও আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি করে। এটি ফিলিস্তিনের ওপর ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের রূপরেখা নির্ধারণ করে এবং এই অঞ্চলে ব্রিটেন ও অন্যান্য শক্তির নীতি ও পদক্ষেপকে প্রভাবিত করে। এছাড়া, এটি ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যার ফলস্বরূপ লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত ও অধিকারহীন হয়ে পড়ে।১৯৩০-এর দশক: আরব বিদ্রোহ
আরব বিদ্রোহ ছিল ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ ও সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং ব্রিটেনের মদতে বৃদ্ধি পাওয়া ইহুদি অভিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের অসন্তোষ থেকে এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। ফিলিস্তিনিরা ব্রিটিশ শাসনের চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ব্যাপক ধর্মঘট, কর প্রদান প্রত্যাখ্যান এবং ইহুদি পণ্য বর্জনের মতো আইন অমান্য ও সশস্ত্র প্রতিরোধের বিভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন এই বিদ্রোহ দমনে হাজার হাজার মানুষকে আটক, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং সামরিক আইন জারির মতো চরম সহিংসতা প্রদর্শন করে। আরব বিদ্রোহ ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতের ওপর গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি, ইহুদি ও ব্রিটিশ সৈন্যের প্রাণহানি ঘটে এবং অনেকে বাস্তুচ্যুত ও নিঃস্ব হয়। এটি ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত, কারণ এটি ব্রিটিশ সমর্থনের সীমাবদ্ধতা এবং একটি ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ও কৌশলের প্রয়োজনীয়তাকে উন্মোচিত করে। এছাড়া, এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে, কারণ এতে পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোর হস্তক্ষেপ ঘটে এবং পরিস্থিতি তদন্তের জন্য লিগ অব নেশনস একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। সর্বোপরি, এটি উপনিবেশবাদ ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের নজির স্থাপন করে।জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা (১৯৪৭)
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ রেজোলিউশন ১৮১ গ্রহণ করে, যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। ফিলিস্তিনি জনগণ এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এটি ফিলিস্তিনের উর্বর উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দ করেছিল। সে সময় ফিলিস্তিনিদের মালিকানায় ছিল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৯৪% ভূমি এবং জনসংখ্যার ৬৭% ছিল ফিলিস্তিনি।হামাস কী? ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত পথনির্দেশিকা
ইউরোপের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, মধ্যযুগে যখন পুরো মহাদেশটি কুসংস্কার, অপরিচ্ছন্নতা আর অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক তখনই আইবেরীয় উপদ্বীপ বা স্পেনের বুকে জ্বলে উঠেছিল এক অনন্য সভ্যতার মশাল। মুসলমানরা এই ভূখণ্ডের নাম দিয়েছিল 'আল-আন্দালুস'।
ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস: আপনার যা জানা প্রয়োজন
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
১৯৪৮ সালের নাকবা (বিপর্যয়)
১৯৪৮ সালের নাকবা (বিপর্যয়) ছিল একটি ট্র্যাজিক ও মর্মান্তিক ঘটনা, যা ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এতে জায়নবাদী শক্তিগুলোর পরিকল্পিত ও সহিংস জাতিগত নিধনের অভিযান অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার আগেই জায়নবাদী মিলিশিয়ারা ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহরগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যতটা সম্ভব ভূমি দখলের চেষ্টা করে। অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা ছিল ১৯৪৮ সালের ৯ এপ্রিল ঘটে যাওয়া দেইর ইয়াসিন গণহত্যা। জেরুজালেমের অদূরে অবস্থিত এই গ্রামে জায়নবাদী যোদ্ধারা নারী ও শিশুসহ ১০০ জনেরও বেশি নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় এবং তাদের ব্যাপকহারে দেশত্যাগে বাধ্য করে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ৫০০টিরও বেশি ফিলিস্তিনি বসতি ধ্বংস ও জনশূন্য করা হয়, যার ফলে প্রায় ১৫,০০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। এভাবেই ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮% ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উদ্ভব ঘটে, যা ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনার সীমানাকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনি—অর্থাৎ স্থানীয় জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি—তাদের ঘরবাড়ি ও ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে অথবা ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট অংশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়।নাকবাত্তোরবর্তী বছরগুলো
নাকবার পর, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনে বসবাসরত ১৪ লক্ষ ফিলিস্তিনির মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ নতুন রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে টিকে থাকতে পেরেছিল, যেখানে তাদের কঠোর সামরিক শাসন ও পদ্ধতিগত বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। বাকিরা পার্শ্ববর্তী দেশ যেমন মিশর ও জর্ডানে অথবা ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের দখলকৃত গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে শরণার্থী হয়। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যারা ইসরায়েলের ভেতর ও বাইরের ফিলিস্তিনিদের আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার তুলে ধরার চেষ্টা করে।ইসরায়েলের স্বৈরাচার: ফিলিস্তিনে দখলদারিত্বের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর অন্যতম মদিনা সনদ ইসলামি রাষ্ট্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।
নাকসা (ছয় দিনের যুদ্ধ) ও বসতি স্থাপন
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের ফলে পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মালভূমি এবং সিনাই উপদ্বীপসহ ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে চলে যায়। এই অঞ্চলগুলো ছিল বহু ফিলিস্তিনির আবাসস্থল, যাদের অনেকে ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ইতোমধ্যেই বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলোতে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনিদের আরও বেশি অধিকারহীন ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়, পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং চলাচল ও সম্পদ আহরণের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করে, যেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের এমন সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষা দেওয়া হয়, যা সামরিক শাসনের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনিদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। এটি আজও বিদ্যমান এক অসম ও অন্যায় পরিস্থিতির জন্ম দেয়।প্রথম ইন্তিফাদা (১৯৮৭-১৯৯৩)
১৯৮৭ সালে গাজায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় চার ফিলিস্তিনি নিহতের পর প্রথম ইন্তিফাদা বা ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের প্রথম অভ্যুত্থান শুরু হয়। এটি বিক্ষোভ, বয়কট এবং ইসরায়েলি সৈন্যদের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে একটি গণপ্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়। ফিলিস্তিনিরা মূলত পাথর নিক্ষেপ, টায়ার পোড়ানো এবং জলপাই গাছ লাগানোর মতো অহিংস কৌশল অবলম্বন করেছিল। তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন গণকমিটিও গঠন করেছিল। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই হামাস-এর উত্থান ঘটে, যারা ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের বিরোধী একটি ইসলামী সামরিক গোষ্ঠী। ইসরায়েলি সরকার নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো, বিচারবহির্ভূত হত্যা, কারফিউ জারি, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া, নির্বাসন এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ইন্তিফাদা দমনের চেষ্টা করে। এই সময়কালটি গণ-সংহতি, ধর্মঘট এবং আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেছিল।অসলো চুক্তি ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ
১৯৯৩ সালে প্রথম ইন্তিফাদা শেষে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠিত হয়, যা পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার কিছু অংশে সীমিত স্বায়ত্তশাসন পরিচালনার কথা ছিল। এর মূল লক্ষ্য ছিল সীমান্ত, নিরাপত্তা, শরণার্থী এবং জেরুজালেমের মতো বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো। তবে পিএ-এর কার্যকারিতা নিয়ে অনেক ফিলিস্তিনি হতাশ, কারণ এটি প্রায়শই ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর সাথে সহযোগিতামূলক আচরণ করেছে এবং তার জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের ওপর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রভাব
দ্বিতীয় ইন্তিফাদা (২০০০)
২০০০ সালে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের নতুন ঢেউ শুরু হয়, যা দ্বিতীয় ইন্তিফাদা নামে পরিচিত। এই অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক অনুঘটক ছিল তৎকালীন ইসরায়েলি বিরোধী দলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারনের জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদে বিতর্কিত পরিদর্শন, যাকে ফিলিস্তিনিরা ইচ্ছাকৃত উস্কানি এবং তাদের ধর্মীয় অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয় এবং ব্যাপক সহিংসতা, আত্মঘাতী বোমা হামলা, সামরিক অভিযান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই সংঘাতের পরিণতি ফিলিস্তিনি জনগণ ও তাদের রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষার জন্য ছিল ধ্বংসাত্মক। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) নিয়ন্ত্রণাধীন অধিকাংশ ভূখণ্ড পুনরায় দখল করে নেয়, চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি ও জনস্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়া, নিরাপত্তার অজুহাতে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে বিশাল এক বিভাজক প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে, যা কার্যকরভাবে ফিলিস্তিনি ভূমির বড় একটি অংশ দখল করে নেয় এবং অনেক সম্প্রদায়কে একে অপরের থেকে ও তাদের সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।ফিলিস্তিনি বিভাজন ও গাজা অবরোধ
২০০৪ সালে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) দীর্ঘদিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যুর পর ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আরাফাত অসলো শান্তি প্রক্রিয়া এবং ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলের সাথে প্রধান আলোচক ছিলেন। ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সামরিক বাহিনী ও প্রায় ৯,০০০ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীকে প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৬৭ সাল থেকে দখলকৃত এই ঘনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা থেকে এই প্রত্যাহার ছিল ফিলিস্তিনিদের সাথে কোনো চুক্তি ছাড়াই ইসরায়েলের একক পদক্ষেপ।আসুন ইসরায়েলের সহিংসতাকে তার প্রকৃত নামেই ডাকি: এটি সন্ত্রাসবাদ, সংঘর্ষ নয়
২০০৬ সালে ফিলিস্তিনিরা ১৯৯৬ সালের পর প্রথমবারের মতো সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, যেখানে ইসলামী আন্দোলন হামাস—যারা পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলো বয়কট করেছিল—আশ্চর্যজনকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করত এবং দলটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও রকেট আক্রমণের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল। হামাসের বিজয় একটি রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়, কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হামাস-নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বা অর্থায়ন করতে অস্বীকার করে এবং তাদের সহিংসতা ত্যাগ, ইসরায়েলকে স্বীকৃতিদান ও পূর্ববর্তী চুক্তিসমূহ মেনে চলার শর্ত আরোপ করে। পিএলও এবং তার প্রধান দল ফাতাহ, যারা ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) পরিচালনা করে আসছিল, তারা হামাসের ক্ষমতার দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকারে যোগ দিতে অসম্মতি জানায়। রাজনৈতিক অচলাবস্থা দ্রুত ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায়, যেখানে উভয় দলেরই সশস্ত্র শাখা ছিল। ২০০৭ সালে সংঘর্ষ তীব্রতর হয় এবং শত শত মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। ২০০৭ সালের জুনে হামাস গাজা উপত্যকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং ফাতাহ বাহিনী ও কর্মকর্তাদের বিতাড়িত করে। ফাতাহ পশ্চিম তীরের অংশবিশেষে তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে, যেখানে ইসরায়েল তার সামরিক দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখে। দুই প্রধান ফিলিস্তিনি দলের এই বিভাজন ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে কার্যত দুটি পৃথক সত্তায় বিভক্ত করে ফেলে, যাদের আলাদা সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। হামাসের গাজা দখলের পর ইসরায়েল ২০০৬ সাল থেকে চলমান অবরোধ আরও জোরদার করে। ইসরায়েল নিরাপত্তার অজুহাতে এবং হামাসকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে গাজায় মানুষ ও পণ্যের চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই অবরোধের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল ধ্বংসাত্মক; গাজার প্রায় বিশ লক্ষ ফিলিস্তিনি খাদ্য, জ্বালানি, পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সম্মুখীন হয়। এই অবরোধ ইসরায়েল ও হামাস এবং অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে কয়েক দফা সশস্ত্র সংঘাতেরও জন্ম দেয়, যারা ইসরায়েলি বিমান হামলা ও অনুপ্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি শহরগুলোতে রকেট নিক্ষেপ করে।গাজায় যুদ্ধ
২০০৮ সাল থেকে গাজা উপত্যকা চারটি বড় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সাক্ষী হয়েছে, যার প্রতিটি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে। ২০০৭ সাল থেকে চলমান ইসরায়েলি অবরোধ মানবিক সহায়তা, জ্বালানি ও নির্মাণ সামগ্রীর প্রবেশকে কঠোরভাবে সীমিত করে দিয়েছে, যা পুনরুদ্ধার ও পুনর্নির্মাণকে অত্যন্ত দুরূহ করে তুলেছে। ইসরায়েলি হামলায় আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ অস্ত্র, যেমন সাদা ফসফরাস ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান ছিল ২০১৪ সালে, যখন ইসরায়েল প্রায় ৫০০ শিশুসহ ২,১০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং আরও ১১,০০০ মানুষকে আহত করে। ইসরায়েলের ভাষায় 'অপারেশন প্রোটেকটিভ এজ' নামের সেই অভিযানে ২০,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।কিউবার প্রতি আমেরিকার নির্মম আচরণ: কূটনৈতিক সম্পর্ক ও মার্কিন স্বার্থসিদ্ধির একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত উদ্বেগ ও চলমান পরিস্থিতির একটি উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বহুমুখী হামলার সূচনা, যাকে তারা "অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড" হিসেবে অভিহিত করেছে। এই অভিযানটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রায় ৩,০০,০০০ রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করে এবং গাজা সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত বসতিগুলো থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়। এই সংঘাতের ফলে বিমান হামলা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে; ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি বিমান হামলা থেকে বাঁচতে জাতিসংঘ পরিচালিত গাজা সিটির স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় খুঁজছে, যদিও জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি স্কুলেও ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল এবং এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনীতিকদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংঘাতের জটিলতা ও ঐতিহাসিক শিকড় ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করা অপরিহার্য করে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত গতিশীল এবং বিশ্ব সম্প্রদায় নিবিড়ভাবে এর প্রতিটি উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করছে, এই আশায় যে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান অর্জিত হবে।



