ইসরায়েলি রাজনীতির বলয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নামটি আজ ক্ষমতা, বিতর্ক এবং বিভাজনমূলক নীতির সমার্থক হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধটি নেতানিয়াহুর উত্থান ও পতন, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে। একাধিক নির্বাচনে জয়লাভ থেকে শুরু করে দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক যাত্রা যেমন অসাধারণ, তেমনি আলোড়নসৃষ্টিকারী। তাঁর শাসনামলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মানচিত্র যে ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, তার গভীরে আলোকপাত করা যাক।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উত্থান ও পতন
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি সচরাচর "বিবি" নামে পরিচিত, তিনি ইসরায়েলের দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্বরত প্রধানমন্ত্রী। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় জয়-পরাজয়ের এক জটিল মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। নেতানিয়াহুর নির্বাচনী সাফল্যগুলো ইসরায়েলি রাজনীতির গোলকধাঁধায় তাঁর দক্ষতার পরিচয় দেয়; যেখানে তিনি পার্লামেন্ট বা নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে প্রায়শই ডানপন্থী জোটের ওপর নির্ভর করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে তাঁর বিজয় পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটি ডানপন্থী জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করে।
ইসরায়েলের সহিংসতাকে তার সঠিক নামেই ডাকা যাক: এটি সংঘর্ষ নয়, সন্ত্রাস
নির্বাচনী সাফল্য সত্ত্বেও নেতানিয়াহুর শাসনামল দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত। ২০১৯ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ ও জালিয়াতিসহ তিনটি দুর্নীতির অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই অভিযোগগুলো তাঁর নেতৃত্বকে চরম বিতর্কের মুখে ঠেলে দেয় এবং দীর্ঘ বারো বছর পর ২০২১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসানের পথ তৈরি করে।
অভিযোগের মুখে পদত্যাগ করার পরিবর্তে, নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক চাতুর্যের পরিচয় দিয়ে সমমনা অতি-রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সাথে জোট সরকার গঠন করেন। এই পদক্ষেপ ইসরায়েলি সমাজকে আরও গভীরভাবে বিভক্ত করে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিচার বিভাগীয় নজরদারি হ্রাস এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার মতো নীতি গ্রহণ করে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে একনায়কতন্ত্রের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন।
জেন্ডার পে গ্যাপ বা লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্য কী? এটি কি আসলেই বিদ্যমান?
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর প্রভাব
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ইসরায়েলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাঁর কঠোর শাসনপদ্ধতি এবং জোটের শরিক অতি-ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান ইসরায়েলি সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় বিধিনিষেধ আরোপের ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও নাগরিক অসহযোগ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। অধিকন্তু, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা উদারপন্থী মিত্রদেশগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
ইসরায়েলের স্বৈরাচার: ফিলিস্তিনে দখলদারিত্বের প্রতি পশ্চিমা সমর্থনের একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন
মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
লেখা জমা দিন
→
নেতানিয়াহুর শাসনামলে ইসরায়েলি অর্থনীতির অবনতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো নেতিবাচক ফলাফলের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ায় দেশের অর্থব্যবস্থা সংকুচিত হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে এবং শেয়ারবাজার টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে এবং নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি মোহভঙ্গ ত্বরান্বিত করেছে।
বিশৃঙ্খলার মাঝে ফিলিস্তিনিদের জন্য সুযোগ
নেতানিয়াহুর শাসন ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করলেও, এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। সামরিক বাহিনীর ভেতরের বিভাজনসহ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা দেশটির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ ফিলিস্তিনি নেতাদের জন্য এমন এক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, যেখানে তারা ইসরায়েলি সমাজের সেই অংশের সাথে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ পাচ্ছেন, যারা একটি অধিকতর সমতাভিত্তিক ও ন্যায়পরায়ণ গণতন্ত্র প্রত্যাশা করে।
আমেরিকার ব্ল্যাকওয়াটার কী? কীভাবে তারা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস ছড়ায়?
ফিলিস্তিনি নেতাদের এই মুহূর্তটি কাজে লাগাতে হবে এবং ইসরায়েলের সাথে তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের এই নতুন পর্যায়ের জটিলতা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী ইসরায়েলিদের সাথে জোটবদ্ধ হওয়া অগ্রগতির পথে অপরিহার্য পদক্ষেপ। জাতীয় পুনর্মিলনের লক্ষ্যে আঙ্কারায় ফিলিস্তিনি নেতাদের সাম্প্রতিক বৈঠকটি এ ক্ষেত্রে একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত।
ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার পেগাসাস: আপনার যা কিছু জানা প্রয়োজন
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকার তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা এবং তাঁর নেতৃত্বকে ঘিরে থাকা বিতর্কগুলোর জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নির্বাচনী বিজয় থেকে শুরু করে দুর্নীতির অভিযোগ পর্যন্ত—তাঁর কার্যকলাপ ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভূচিত্রকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অভ্যন্তরীণ ক্রমবর্ধমান বিভাজন ইহুদি রাষ্ট্রটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও এই বিশৃঙ্খলার মাঝে, ন্যায়সঙ্গত ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যতের সন্ধানে ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরায়েলি সমাজের মোহভঙ্গ হওয়া অংশগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
'ওক' (Woke) কালচার কী? এটি কেন এত বিতর্কিত?
ইসরায়েল আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং দেশটিকে অবশ্যই নেতানিয়াহুর নীতির কুফলগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। দেশটি আরও বেশি স্বৈরাচারের দিকে ধাবিত হবে নাকি নিজেকে রক্ষা করার পথ খুঁজে পাবে, তা নির্ভর করছে তাদের নেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর এবং এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের সক্ষমতার ওপর। এক নতুন যুগের সূচনা আসন্ন, আর এখনকার সিদ্ধান্তগুলোই ইসরায়েলের ভাগ্য এবং ফিলিস্তিনিদের সাথে তাদের সম্পর্কের স্বরূপ নির্ধারণ করবে।

রাকিবুল ইসলামলেখক (Author)
আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।