Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা?

সারকথা

পশ্চিমা মিডিয়ার শেখানো বুলি ভুলে গিয়ে একবার মানচিত্রের দিকে তাকান। মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্তহীন রক্তপাতের আড়ালে আসলে চলছে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের লাইফলাইন—'হরমুজ প্রণালী' নিয়ন্ত্রণের এক নোংরা স্নায়ুযুদ্ধ।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০২৬•পড়তে ৪ মিনিট লাগবে
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা?

আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে আপনার ড্রয়িংরুমে বসে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা মধ্যপ্রাচ্য সংকট কেবলই কিছু 'উগ্রবাদী' গোষ্ঠী আর 'গণতন্ত্রকামী' পশ্চিমাদের মধ্যকার এক আদর্শিক লড়াই? 

বছরের পর বছর ধরে সিএনএন বা বিবিসির মতো পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যম আপনাকে প্রতিদিন যে পরিষ্কার, সাদাকালো ন্যারেটিভ গিলতে বাধ্য করছে, তার পেছনের আসল সত্যটা কি কখনো তলিয়ে দেখেছেন?

যদি বলি, ধ্বংসস্তূপ আর রক্তপাতের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াই, যার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো মানবতা বা শান্তির ইচ্ছা নেই, বরং রয়েছে 'কালো সোনা' আর একটি সরু জলপথের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ—তাহলে কি খুব অবাক হবেন?

আসুন, পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার রঙিন চশমাটা খুলে অত্যন্ত রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হই।

আসল রণাঙ্গন: ২১ মাইলের এক অর্থনৈতিক লাইফলাইন

আবেগ আর মানবাধিকারের বুলি সরিয়ে রেখে একটু মানচিত্রের দিকে তাকান। ওমান এবং ইরানের মাঝখানে অবস্থিত মাত্র ২১ মাইল চওড়া একটি জলপথ—হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী শুধু একটি সাধারণ সামুদ্রিক পথ নয়, এটি আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল ধমনী।

সম্পর্কিত বিশ্লেষণ
পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?

পিকেকে-র বিলুপ্তির ঘোষণা: তুরস্কের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ, নাকি কুর্দিদের জন্য অধিকার হারানোর নতুন ঝুঁকি?

রাকিবুল ইসলাম • ইতিহাস
সম্পূর্ণ পড়ুন →
  • তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ: প্রতিদিন বিশ্বের মোট বিক্রীত তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ (প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল) এই প্রণালী দিয়েই পার হয়।
  • গ্যাসের চাবিকাঠি: বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই রুট দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার গন্তব্যে পৌঁছায়।

অর্থাৎ, এই সরু জলপথটি যদি কোনো কারণে কয়েক সপ্তাহের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তেলের দাম এক রাতেই আকাশ ছোঁবে, শিল্পকারখানা স্থবির হবে এবং পশ্চিমা বিশ্বে মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। 

আর ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে আসল ভূ-রাজনৈতিক খেলা। পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র ফেরাতে যায় না, তারা যায় তেলের ব্যারেল আর সাপ্লাই চেইন সুরক্ষিত করতে।

পশ্চিমা কপটতা ও দ্বিমুখী নীতির নগ্ন রূপ

এবার আসুন পশ্চিমা কপটতার কথায়। ওয়াশিংটন, লন্ডন আর তেল আবিব যখন মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন আর 'আত্মরক্ষার' অধিকার নিয়ে লম্বা ভাষণ দেয়, তখন তাদের আয়নায় নিজেদের চেহারা একবার দেখা উচিত নয় কি?

মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED

মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন

আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

লেখা জমা দিন →

যে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের সুরক্ষার জন্য রাতারাতি 'আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের' (International Maritime Law) দোহাই দিয়ে সামরিক জোট গঠন করে, সেই একই যুক্তরাষ্ট্র যখন গাজায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (International Humanitarian Law) প্রকাশ্য লঙ্ঘন দেখে বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একের পর এক ভেটো দিয়ে যুদ্ধবিরতি আটকে দেয়—তখন তাদের সেই বিশ্বপ্রেম ও আইনপ্রেম কোথায় যায়?

ইউক্রেনীয়রা দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়লে পশ্চিমাদের চোখে তারা হয় 'герой' বা হিরো। তাদের জন্য পাঠানো হয় বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও সহায়তা। আর এই অঞ্চলে ফিলিস্তিন বা অন্য কোনো জাতি যখন নিজেদের ভূমি ও অধিকার রক্ষার কথা বলে, তখন রাতারাতি তারা হয়ে যায় 'সন্ত্রাসী' বা 'বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি'! এই সংজ্ঞার কপিরাইট কি কেবল ওয়াশিংটনের হাতে? 

এই চরম দ্বিমুখী নীতি কি কেবলই অন্ধত্ব, নাকি এক সুপরিকল্পিত সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা, যা দশকের পর দশক ধরে একটি অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে?

বিশেষ সুপারিশ
ফিলিস্তিনি সংকট ও আব্রাহাম চুক্তিঃ সমালোচনা, সুফল ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আজ যে উত্তেজনায় ভরা, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ফিলিস্তিনি সংকট এবং আব্রাহাম চুক্তি নামের এক পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক প্যাকেজ।

রাকিবুল ইসলাম • অভিমত
সম্পূর্ণ পড়ুন →

নতুন স্নায়ুযুদ্ধ এবং আসল খেলোয়াড়

পর্দার পেছনের আসল খেলোয়াড়দের দিকে একটু গভীরভাবে তাকালে আপনি বুঝবেন, হরমুজ প্রণালী ও চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ভূ-রাজনীতি একে অপরের সাথে এতটাই নিবিড়ভাবে যুক্ত যে, এটি একবিংশ শতাব্দীর নতুন স্নায়ুযুদ্ধের মূল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

এখানে লড়াইটা কোনোভাবেই ধর্ম, বর্ণ বা গণতন্ত্রের নয়। এখানে লড়াইটা হলো বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের:

  1. মার্কিন আধিপত্যবাদ ও পেট্রোডলার: যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে চাইছে এই প্রণালীর ওপর তাদের নৌ-আধিপত্য বজায় রাখতে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—প্রয়োজনে যেন তারা চীনের মতো উদীয়মান পরাশক্তির জ্বালানি সরবরাহের টুঁটি চেপে ধরতে পারে। 

কারণ, চীনের আমদানিকৃত তেলের এক বিশাল অংশ এই পথেই যায়। পাশাপাশি, বিশ্ববাজারে তেলের বাণিজ্য যেন ডলারেই (Petrodollar) হয়, তা নিশ্চিত করাও ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

  1. নতুন অক্ষশক্তির উত্থান: অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য গুঁড়িয়ে দিতে ইরান, রাশিয়া এবং চীন মিলে তৈরি করেছে এক নতুন কৌশলগত অক্ষ। বেইজিং এবং মস্কো তেহরানকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে। কারণ তারা জানে, হরমুজ প্রণালী এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য খর্ব করা মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ওয়াশিংটনের একাধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা।

ব্রিকস (BRICS)-এর সাম্প্রতিক সম্প্রসারণ এবং ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর (De-dollarization) চেষ্টাও এই বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলারই অংশ।

একটি রূঢ় বাস্তবতা

উপসংহারে যাওয়ার আগে আপনার জন্য একটি প্রশ্ন রেখে যাই। যখন দেখবেন কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রনেতা 'শান্তি', 'মানবাধিকার' আর 'স্থিতিশীলতার' দোহাই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বা যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছেন, তখন নিজেকে শুধু এইটুকু জিজ্ঞেস করবেন—তারা কি সত্যিই মানুষের জীবন বাঁচাতে এসেছেন, নাকি তেলের পাইপলাইন আর শিপিং রুট বাঁচাতে?

যতদিন পর্যন্ত আমরা এই তথাকথিত 'মুক্ত বিশ্বের' নেতাদের মানবাধিকারের মুখোশের পেছনের রক্তাক্ত সাম্রাজ্যবাদী চেহারাটা চিনতে না পারব, ততদিন এই রক্তপাত থামবে না। কারণ, বিশ্বব্যবস্থার এই নোংরা খেলায়, আন্তর্জাতিক আইনের কোনো দাম নেই; এখানে মজলুমের রক্ত দিয়ে লেখা হয় পরাশক্তিগুলোর জ্বালানির হিসাব।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?ইতিহাস

পিকেকে-র বিলুপ্তি: তুরস্কের জন্য সুযোগ নাকি কুর্দিদের জন্য নতুন সংকট?

পিকেকে-র বিলুপ্তির ঘোষণা: তুরস্কের সামনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ, নাকি কুর্দিদের জন্য অধিকার হারানোর নতুন ঝুঁকি?

১২ মে ২০২৫পড়ুন →
ফিলিস্তিনি সংকট ও আব্রাহাম চুক্তিঃ সমালোচনা, সুফল ও বাস্তবতাঅভিমত

ফিলিস্তিনি সংকট ও আব্রাহাম চুক্তিঃ সমালোচনা, সুফল ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আজ যে উত্তেজনায় ভরা, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ফিলিস্তিনি সংকট এবং আব্রাহাম চুক্তি নামের এক পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক প্যাকেজ।

১৪ অক্টোবর ২০২৫পড়ুন →
সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রেরঃ নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রেরঃ নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা

গত ১৩ মে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের রিয়াদে এক বিনিয়োগ সম্মেলনে সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন।

১৪ মে ২০২৫পড়ুন →
আব্রাহাম চুক্তিঃ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, এবং ফিলিস্তিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতারাজনীতি

আব্রাহাম চুক্তিঃ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, এবং ফিলিস্তিনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

আব্রাহাম চুক্তি হলো ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন সহ আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য একাধিক চুক্তির সমষ্টি।

৯ এপ্রিল ২০২৫পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।