বর্তমান পরিস্থিতি
তথাকথিত এই ‘সংঘর্ষের’ সর্বশেষ অধ্যায়টি ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়, যখন ইসরায়েলি পুলিশ বারবার জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনি উপাসকদের ওপর চড়াও হয়। এর ফলে শত শত ফিলিস্তিনি আহত ও গ্রেপ্তার হন; ইসরায়েলি বাহিনী রাবার বুলেট, লাঠি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের ব্যবহারে নিজেদের পারদর্শিতা প্রদর্শন করে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি পুলিশের ক্ষয়ক্ষতি ছিল নগণ্য। এরপর রকেট হামলার অভিযোগ তুলে ইসরায়েল গাজা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননে নির্বিচারে বিমান হামলা চালায়। সহিংসতার এই সর্বশেষ ঘটনাটি ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের দীর্ঘ ধারার আরও একটি অধ্যায় মাত্র, যা অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
‘সংঘর্ষ’ শব্দটির ব্যবহার
গণমাধ্যমের ‘সংঘর্ষ’ শব্দটি ব্যবহারের নেপথ্যে রয়েছে ইসরায়েলের সহিংসতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে আড়াল করা এবং এই বাস্তবতা গোপন রাখা যে, ইসরায়েল যে হারে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তা কোনোভাবেই ‘সংঘর্ষের’ অপর পক্ষের সাথে তুলনীয় নয়। ‘সংঘর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, এই সহিংসতার জন্য উভয় পক্ষই সমানভাবে দায়ী, যা একেবারেই সত্য নয়। এটি সেই বাস্তবতাকেও আড়াল করে যে, ফিলিস্তিনিদের তরফ থেকে যে প্রতিরোধ আসছে, তা মূলত প্রায় ৭৫ বছর ধরে চলে আসা ইসরায়েলি নীতি—যথা ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন, ভূমি দখল এবং পর্যায়ক্রমিক গণহত্যার বিরুদ্ধে এক স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

সংঘাতের বাস্তবতা
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ বিশ্বের অন্যতম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। এর মূলে রয়েছে জায়নবাদী আন্দোলন, যারা ফিলিস্তিনের মাটিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছিল, এবং সেই আন্দোলনের প্রতি আরবদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সেই থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতা ও বিরোধের এক দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছে। ইসরায়েল বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য সামরিক অভিযান চালিয়ে নারী ও শিশুসহ অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। তবুও গণমাধ্যম প্রায়ই বিষয়টিকে দুই পক্ষের ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে চিত্রিত করে এবং বোঝাতে চায় যে, উভয় পক্ষই এই সহিংসতার জন্য সমান দায়ী।
একনায়কতন্ত্র ও মানবাধিকার: স্বাধীনতার চলমান সংগ্রাম
আমেরিকান মিডিয়া সত্যকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ধরণের "ফিল্টার" ব্যবহার করে। তারা জাতিগত পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে অপরাধীদের আলাদা পরিচয় দেয়।
গণমাধ্যমের পক্ষপাত
ইসরায়েলি বয়ানের প্রতি গণমাধ্যমের এই নতিস্বীকার নতুন কিছু নয়। এর অনেকটা কারণ হলো ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সমর্থন, যা আগ্রাসকদের ভুক্তভোগী হিসেবে এবং গণহত্যাকে আত্মরক্ষা হিসেবে তুলে ধরে। ইসরায়েলের সহিংসতাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে গণমাধ্যমের এই ব্যর্থতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ‘সংঘর্ষ’ শব্দটির ব্যবহার প্রকারান্তরে ইসরায়েলি সহিংসতার বৈধতা দেয়, যেন এটি দুটি সমান শক্তিশালী পক্ষের মধ্যে একটি ন্যায়সঙ্গত লড়াই।
নোম চমস্কি: এই শতাব্দীর সবচেয়ে উত্তপ্ত ও অপ্রিয় মুখপাত্র
প্রোপাগান্ডা যুদ্ধ
ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরেই প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের যুদ্ধে লিপ্ত, যার লক্ষ্য হলো নিজস্ব নীতিকে বৈধতা দেওয়া এবং ফিলিস্তিনিদের দাবির বৈধতা নষ্ট করা। তারা ভাষা, চিত্র এবং বয়ানের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি সহিংসতার মধ্যে এক কৃত্রিম ও ভ্রান্ত সমতা তৈরি করে।
‘সংঘর্ষ’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে গণমাধ্যম এমন একটি মিথ বা পৌরাণিক বয়ান টিকিয়ে রাখে, যেখানে মনে হয় এটি একটি দুই পক্ষের সংঘাত এবং উভয় পক্ষই সমান অপরাধী। এই বয়ান ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে থাকা আকাশ-পাতাল শক্তির পার্থক্যকে আড়াল করে দেয়—যেখানে একদিকে রয়েছে মার্কিন সমর্থনে বলীয়ান একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত রাষ্ট্র, আর অন্যদিকে রয়েছে ন্যূনতম সম্পদ ও সমর্থনহীন, প্রায় রাষ্ট্রহীন ফিলিস্তিনি জাতি।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
তদুপরি, ইসরায়েলি সূত্রের ওপর গণমাধ্যমের অতিনির্ভরশীলতা এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা ইসরায়েলি সরকারের সেই বয়ানকেই শক্তিশালী করে যে, তারা কোনো দখলদারিত্ব চালাচ্ছে না, বরং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য কীভাবে ইরাক আগ্রাসনের ন্যায্যতা প্রমাণে সচেষ্ট হয়েছিল
পশ্চিমা সরকারগুলোর ভূমিকা
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের কভারেজ পশ্চিমা সরকারগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্রদান করে এবং ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা সম্বলিত জাতিসংঘের যেকোনো প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়ে আসছে।
২০২৩ সালের ২৮ মের ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কামাল কিলিচদারওগলুকে পরাজিত করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হয়েছেন রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। এই বিজয়ের ভূরাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রভাবের গভীর বিশ্লেষণ।
ইসরায়েলের প্রতি এই সমর্থনের মূলে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং উদার গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো অভিন্ন মতাদর্শ।
ফলস্বরূপ, পশ্চিমা সরকার এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো ইসরায়েলের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোতেও সমালোচনা করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। ইসরায়েলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার এই অনিচ্ছা সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে এবং ইসরায়েলি সরকারের দায়মুক্তির বোধকে আরও শক্তিশালী করে।
যুক্তরাষ্ট্র কি একটি শীর্ষ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র?
উপসংহার
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান সহিংসতাকে বর্ণনা করতে ‘সংঘর্ষ’ শব্দটির ব্যবহার শুধু ভুলই নয়, বরং এটি একটি দুই পক্ষের সংঘাতের ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল একটি অত্যন্ত সামরিকায়িত রাষ্ট্র, যারা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে রেখেছে; আর ফিলিস্তিনিরা একটি প্রায় রাষ্ট্রহীন জাতি, যারা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের জন্য লড়াই করছে।
এই সংঘাতের সঠিক প্রতিবেদন তুলে ধরা এবং সব পক্ষকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। এর জন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার মানসিকতা এবং শক্তির ভারসাম্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা।
এক্ষেত্রে পশ্চিমা সরকারগুলোরও উচিত ইসরায়েলের প্রতি তাদের সমর্থনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এবং এই অঞ্চলের সব মানুষের মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। একমাত্র তখনই ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আশা করা সম্ভব।




