Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন

সারকথা

মানবাধিকার কোনো আকস্মিক আবিষ্কার নয়। কোনো গবেষণাগারে বসে কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় ধ্যানে মগ্ন হয়ে কেউ মানবাধিকারের ধারণাটি খুঁজে বের করেনি। মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে, মানবশিশুর জন্মের পর থেকেই মানবাধিকারের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এটি একান্তই প্রাকৃতজাত; সমাজকাঠামোর প্রতিটি স্তরেই এর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনস্বীকার্য।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১৮ এপ্রিল ২০২২•পড়তে ৮ মিনিট লাগবে
মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন
মানবাধিকার হঠাৎ আবিষ্কৃত কোনো বিষয় নয়। এমন নয় যে, ল্যাবরেটরিতে বসে কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় ধ্যানমগ্ন হয়ে কেউ মানবাধিকার আবিষ্কার করেছেন। মানব সভ্যতার সূচনা থেকে, একটি শিশুর জন্মলগ্ন থেকেই মানবাধিকার বিদ্যমান। এটি প্রাকৃতজাত এবং সমাজকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেবল সময়ভেদে সভ্য সমাজ মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে কিংবা অস্বীকার করেছে। আমরা কোন বিষয়গুলোকে মানবাধিকার হিসেবে গ্রহণ করব আর কোনগুলোকে করব না, তা সম্পূর্ণভাবে সমাজের ওপর নির্ভরশীল। মানবাধিকার হলো সেই মৌলিক অধিকার, যা উচ্চতর জীবনমান অর্জন কিংবা জীবনযাত্রার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এই নিবন্ধে আমরা মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানবাধিকারের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ এবং এর ধারণার বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করব। শুরু করা যাক। মানবাধিকার বলতে মূলত সেই মৌলিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে বোঝায়, যা একজন ব্যক্তি হিসেবে প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য। প্রারম্ভিক পর্যায়ে এগুলোকে 'প্রাকৃতিক অধিকার' বা 'মানুষের অধিকার' বলা হতো, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল জীবনধারণের অধিকার, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ।
মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন, জেরুজালেম বিক্ষোভে প্রতীকী ফিলিস্তিনি বালক maroonpaper.com
বর্ণ, গোত্র, ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতীয়তা নির্বিশেষে মানুষের জন্মগত অধিকারই হলো মানবাধিকার। এগুলো এমন কিছু যা ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অত্যাবশ্যক। এই অধিকারগুলো জন্মগতভাবেই মানুষের সহজাত এবং মৌলিক। যেহেতু জন্মমুহূর্ত থেকেই মানুষ এ অধিকার লাভ করে, তাই এগুলো অলঙ্ঘনীয় এবং অবিচ্ছেদ্য।

মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তন

মানবাধিকারের সুগভীর ইতিহাস একদিনে আজকের এই পর্যায়ে এসে পৌঁছায়নি। সময়ের পরিক্রমায় এবং মানব সভ্যতার সমৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে মানবাধিকার আজকের এই সুসংহত রূপ লাভ করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ কী?

ইতিহাসজুড়ে মানব সভ্যতার বিবর্তনে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার ধারণাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল; ঠিক যেমনটি ছিল বৃহত্তর সমাজের সাথে ব্যক্তির সম্পর্কের প্রশ্নটি। এই ধারণাগুলোর শিকড় ব্যাবিলনীয়, চীনা এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলো গ্রিক ও রোমান আইনকে প্রভাবিত করেছে এবং বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, কনফুসীয়, হিন্দু, ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের শিক্ষায় এর প্রতিফলন ঘটেছে। যেসব সমাজে লিখিত নথিপত্র ছিল না, সেখানেও নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে মানবাধিকারের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে নিচের পর্যায়গুলোতে বিভক্ত করা যেতে পারে:

গ্রিক আমলের পূর্বে মানবাধিকার

হামুরাবি সংহিতা হলো আইন সংহিতকরণের অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ, যেখানে ব্যক্তিগত অধিকারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রায় ৪০০০ বছর আগে সুমেরীয় রাজা হামুরাবি এই ফলকটি তৈরি করেছিলেন। আধুনিক মানদণ্ডে নিষ্ঠুর মনে হলেও, সেই ২৮২টি আইনের ব্যবস্থাটি একটি আইনি কাঠামোর প্রোটোটাইপ তৈরি করেছিল। এই ধরনের নজির ও আইনত বলবৎযোগ্য নথির মাধ্যমে মানুষকে নির্বিচারে বিচার ও শাস্তি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে হামুরাবির কোডের সীমাবদ্ধতা ছিল মূলত এর কার্যকারণ-ভিত্তিক প্রকৃতিতে; এটি জাতি, ধর্ম, বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত ধারণাগুলোর জন্য কোনো সুরক্ষা প্রদান করেনি।

গ্রিক আমলে মানবাধিকার

প্রাচীন গ্রিসে মানবাধিকার কেবল নির্বিচার নিপীড়ন থেকে সুরক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর অর্থ ধারণ করতে শুরু করে। গ্রিকরাই প্রথম প্রাকৃতিক আইনের ধারণা নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিল। তারা সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সার্বজনীন আইনের প্রস্তাব করেছিল, যার অধীনে সকল মানুষ সমান এবং সকলে একই আইনের অনুগত। প্রাকৃতিক আইন থেকে উদ্ভূত অধিকারগুলো মানবাধিকারের সমার্থক হয়ে ওঠে।

সিকিম কীভাবে ভারতের অংশ হয়েছিল?

এই প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও, আজকের মানবাধিকার এবং তৎকালীন প্রাকৃতিক অধিকারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দাসপ্রথাকে তখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো, অথচ এই চর্চা স্বাধীনতা ও সাম্যের আধুনিক ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, যাকে আমরা আজকের মানবাধিকারের সাথে যুক্ত করি।

রোমান আমলে মানবাধিকার

প্রাচীন রোমেও প্রাকৃতিক অধিকারের ধারা অব্যাহত ছিল। রোমান আইনজ্ঞ উলপিয়ান মনে করতেন, প্রাকৃতিক অধিকার প্রত্যেকের প্রাপ্য, তারা রোমান নাগরিক হোক বা না হোক। রোমান আইন তিন ভাগে বিভক্ত ছিল: জাস সিভিল (Jus Civile), জাস জেন্টিয়াম (Jus Gentium) এবং জাস ন্যাচারাল (Jus Naturale)। প্রথম দুটি ছিল সাধারণ আইন, যা তৃতীয় ধারণাটি (jus naturale)—অর্থাৎ প্রাকৃতিক আইনের নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যদিও তা সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য ছিল না। মানবাধিকারের উৎপত্তি গ্রিকো-রোমান 'স্টোয়িকবাদ' (Stoicism) থেকে হয়েছে বলে মনে করা হয়। এই দর্শনের মতে, সমগ্র সৃষ্টিজগতের মূলে একটি মহাজাগতিক শক্তি বিদ্যমান এবং সেই প্রাকৃতিক আইনের আলোকেই মানুষের আচরণের বিচার হওয়া উচিত।

খ্রিস্টীয় যুগে মানবাধিকার

রোমান আমলের পরেও প্রাকৃতিক আইনের ধারণা টিকে ছিল। তবে সেই সময়ে প্রাকৃতিক আইনকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রকাশিত ঈশ্বরের ইচ্ছা হিসেবে দেখা হতো। খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদদের মতে, যাবতীয় আইন, শাসন এবং সম্পদ ছিল পাপের ফল; তাই ঈশ্বরের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক যেকোনো মানবসৃষ্ট আইন পরিত্যাগযোগ্য। স্বর্গীয় আইনের ধারক হিসেবে চার্চের ক্ষমতা ছিল রাষ্ট্রের চেয়ে ঊর্ধ্বে।

আইনের শাসন বলতে কী বোঝায় এবং এর মৌলিক নীতিগুলো কী?

ইসলামি যুগে মানবাধিকার

ইসলামই ইতিহাসের প্রথম ধর্ম, যা মানবাধিকারের একটি ব্যাপক এবং সর্বজনীন ধারণা প্রদান করেছে। ইসলামে মানবাধিকার মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের নীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই অধিকারগুলোর লক্ষ্য হলো মানবতার সম্মান পুনরুদ্ধার করা এবং শোষণ, নিপীড়ন ও অবিচারের মূলোৎপাটন করা। কুরআনের সূরা হুজরাতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, *“হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (ধর্মপরায়ণ)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সব বিষয়ে অবহিত।”* মানবাধিকারের গভীরে এই বিশ্বাস নিহিত রয়েছে যে, আল্লাহই আইনদাতা এবং মানবাধিকারের উৎস। কোনো শাসক, সরকার বা কর্তৃপক্ষ আল্লাহর দেওয়া মানবাধিকারকে কোনোভাবেই সীমাবদ্ধ বা লঙ্ঘন করতে পারে না। যেহেতু এর উৎস ঐশ্বরিক, তাই এই অধিকারগুলো সমর্পণযোগ্য নয়। রাজাদের বা সংসদের দেওয়া অধিকারের বিপরীতে এগুলো স্থায়ী, পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয়।

ম্যাগনা কার্টায় মানবাধিকার

১২১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা জন কর্তৃক প্রদত্ত ম্যাগনা কার্টা মানবাধিকারের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ম্যাগনা কার্টার মূল বিষয়বস্তু ছিল রাজার স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষা। এর ফলে ভূমিস্বত্ব ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নিষিদ্ধ হয়, বিচারকদের আইনের প্রতি অনুগত থাকার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কর ধার্য করা বন্ধ হয়। ম্যাগনা কার্টার ৩৯ নম্বর ধারা জুরি ট্রায়ালের ধারণার জন্ম দেয়, যা নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ম্যাগনা কার্টা প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে, রাজার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়। পরবর্তীতে ১৬২৮ সালের 'পিটিশন অফ রাইটস' এবং ১৬৮৯ সালের 'বিল অফ রাইটস' এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

আইনের শাসন কী এবং গণতান্ত্রিক সমাজে এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ফরাসি মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে মানবাধিকার

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সময় 'মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার ঘোষণা' গৃহীত হয়। এতে ঘোষণা করা হয়, "মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং অধিকারের দিক থেকে সমান," এবং "এই অধিকারের মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অধিকার।" ১৭৭৬ সালে লিখিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রেও মানবাধিকারের একই ধারণা বিদ্যমান ছিল।

বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগে মানবাধিকার

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে লিগ অফ নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল। যদিও লিগ অফ নেশনসের সনদে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা ছিল না, তবুও এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি প্রসারিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবাধিকারের ধারণা আরও সুসংহত হয়। যুদ্ধের সময়কার ভয়াবহতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্বজনমতকে জাগ্রত করে এবং মানবাধিকারকে একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ সৈন্য ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায় বা পঙ্গু হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিজয়ী শক্তিগুলো ভবিষ্যৎ রক্তপাত রোধ এবং একটি উন্নত সমাজ গঠনে সহায়তা করার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের বিষয়ে একমত হয়। ১৯৪৫ সালে এই নতুন সংস্থাটি 'জাতিসংঘ' (UN) নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রসার এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো এমন এক বিশাল ও জটিল প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা মানব কর্মকাণ্ডের প্রায় প্রতিটি দিককে অন্তর্ভুক্ত করে।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা, ১৯৪৮

জাতিসংঘ তার শুরুর বছরগুলো থেকেই মানবাধিকারের এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রচারের উদ্যোগ নেয়, যা বিশ্বের সকল মানুষ ও রাষ্ট্রের উপকারে আসবে। এই দলিলগুলো জাতিসংঘের সভায় লেখা হয়েছে, যেখানে সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন এবং উপযুক্ত শব্দচয়নের জন্য আলোচনা করেছেন। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা গৃহীত হওয়া মানবাধিকারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রথম বড় সাফল্য। যদিও এর খসড়া নিয়ে জাতিসংঘের সদস্যদের মধ্যে জোর বিতর্ক হয়েছিল, তবুও এর অনুমোদন মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে অত্যন্ত মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়। এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক দলিল, যা মানবাধিকারকে সংহত ও স্বীকৃতি প্রদান করেছে। সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত অধিকারগুলোকে দুটি বড় শিরোনামে ভাগ করা যায়। একটি হলো নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, অন্যটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার। সর্বজনীন ঘোষণার ২ থেকে ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে এবং ২২ থেকে ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণা ১৯৪৮ সালের সনদের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে কিছু অধিকার ও স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাও নির্ধারণ করে দেয়। এতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকেরই সমাজের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, যার মাধ্যমেই কেবল ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের চূড়ান্ত ও পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। ১৯৪৮ সালে গৃহীত এই সর্বজনীন ঘোষণাটি বর্তমানের আইনত বলবৎযোগ্য অসংখ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা যখনই অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলি, বিরোধ নিষ্পত্তি করি, কোনো নিপীড়িত দেশে বসবাস করি কিংবা প্রত্যেকের মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, তখনই এই ঘোষণা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। এই ঘোষণা একটি বৈশ্বিক বোঝাপড়ার প্রতিনিধিত্ব করে যে, প্রতিটি মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং সমমর্যাদা ও অধিকারের অধিকারী। এই অধিকার ও স্বাধীনতাগুলো অলঙ্ঘনীয় এবং সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জাতি, বাসস্থান, লিঙ্গ, জাতীয় বা জাতিগত উৎস, বর্ণ, ধর্ম, ভাষা বা অন্য যেকোনো মর্যাদা নির্বিশেষে আমাদের সবার জন্য মর্যাদা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছিল।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
করফু চ্যানেল মামলা (১৯৪৯)ঃ আন্তর্জাতিক আদালতের প্রথম রায় ও ঐতিহাসিক আইনি বিশ্লেষণআইন

করফু চ্যানেল মামলা (১৯৪৯)ঃ আন্তর্জাতিক আদালতের প্রথম রায় ও ঐতিহাসিক আইনি বিশ্লেষণ

করফু চ্যানেল মামলা (১৯৪৯)-এর ঘটনা, আইনি ইস্যু এবং ICJ-এর ঐতিহাসিক রায় সম্পর্কে জানুন। ইনোসেন্ট প্যাসেজ ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬পড়ুন →
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধ (২০১২)ঃ আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায় ও আইনি বিশ্লেষণআইন

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধ (২০১২)ঃ আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায় ও আইনি বিশ্লেষণ

দীর্ঘ চার দশকের জট এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর, জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অফ দ্য সি (ITLOS)-এর ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধ-এর শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটে।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬পড়ুন →
সিভিল ল কী? উৎপত্তি, ঐতিহাসিক বিকাশ এবং প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহআইন

সিভিল ল কী? উৎপত্তি, ঐতিহাসিক বিকাশ এবং প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে উদ্ভূত এবং রোমান আইনের দর্শনে ঋদ্ধ সিভিল ল বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক প্রচলিত একটি আইনি ব্যবস্থা। বিধিবদ্ধ আইনের কাঠামো ও ইনকুইজিটোরিয়াল বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি কমন ল থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।

২৫ আগস্ট ২০২৩পড়ুন →
মানবাধিকারের সুরক্ষা, প্রসার ও সংশ্লিষ্ট কার্যপদ্ধতিআইন

মানবাধিকারের সুরক্ষা, প্রসার ও সংশ্লিষ্ট কার্যপদ্ধতি

জাতিসংঘ সনদে সুস্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে যে, 'মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তা সমুন্নত রাখা' বিশ্বসংস্থাটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

২২ জানুয়ারি ২০২৩পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।