একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান কেবল সরকার পরিচালনার প্রশাসনিক যন্ত্রের বিবরণ দেয় না; বরং তা রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দর্শনও ধারণ করে। দক্ষিণ এশীয় ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংবিধানে এই দর্শনকে 'রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি' (Fundamental Principles of State Policy বা Directive Principles) হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ৮ থেকে ২৫) এই নীতিগুলো সন্নিবেশিত।
সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা—এই চারটি স্তম্ভকে মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে ৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: "এই ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ বাংলাদেশ পরিচালনার মূল ভিত্তি হইবে, আইন প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তাহা প্রয়োগ করিবে, এই সংবিধান ও অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তাহা নির্দেশক হইবে... তবে এই নীতিসমূহ আদালতে বলবৎযোগ্য হইবে না।"
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যা 'মৌলিক ভিত্তি', আদালতে তা কেন 'বলবৎযোগ্য নয়'? এটি কি নিছক 'আবেগের প্রদর্শনী' নাকি সংবিধানের এক গভীর দার্শনিক কম্পাস? এই সাংবিধানিক দ্বন্দ্বই আইনবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির দার্শনিক ও তাত্ত্বিক উৎস
সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বা নির্দেশক নীতি অন্তর্ভুক্তির ধারণাটি প্রথম ব্যাপকভাবে গৃহীত হয় আয়ারল্যান্ডের ১৯৩৭ সালের সংবিধানে (Bunreacht na hÉireann)। সংবিধান প্রণেতারা অনুধাবন করেছিলেন যে, নাগরিকের নেতিবাচক অধিকারগুলোকে (যেমন: বেআইনি আটক থেকে মুক্তি, বাক্স্বাধীনতা) আদালত দিয়ে অবিলম্বে বলবৎ করা সম্ভব হলেও ইতিবাচক আর্থ-সামাজিক অধিকারগুলো (যেমন: সবার জন্য খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান) রাতারাতি আইন জারি করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বিপুল রাজস্ব সক্ষমতা।
কল্যাণ রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে কোন অর্থনৈতিক বৈষম্য নেই এবং যেখানে নাগরিকদের কল্যাণই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনায় আমরা কল্যাণ রাষ্ট্র কি বা কাকে বলে জানার চেষ্টা করব।

বাংলাদেশ সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যের এক বিশাল তালিকা রয়েছে: কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি (অনুচ্ছেদ ১৪), অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা (অনুচ্ছেদ ১৫), অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা (অনুচ্ছেদ ১৭), জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা (অনুচ্ছেদ ১৮), পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (অনুচ্ছেদ ১৮ক), এবং সুযোগের সমতা (অনুচ্ছেদ ১৯)।
মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ: অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২-এর অধীনে প্রতিকার কীভাবে কাজ করে
মূলনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও সমালোচকদের মূল্যায়ন
আইনবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন:
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
- রাষ্ট্রীয় আদর্শের শীর্ষ প্রতীক (Beau Idéal): প্রবক্তারা মনে করেন, এটি মুক্তিযুদ্ধের মহান অঙ্গীকারের রূপরেখা। ঔপনিবেশিক শোষণমুক্ত এক সাম্যবাদী ও শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি এখানে ব্যক্ত হয়েছে।
- আবেগের ডাস্টবিন তত্ত্ব (A Veritable Dustbin of Sentiment): ব্রিটিশ আইনবিদ স্যার আইভর জেনিংস এবং সমালোচকদের মতে, যে নীতি লঙ্ঘিত হলে নাগরিক আদালতে যেতে পারেন না, তা সংবিধানে নিছক ফাঁকা অলঙ্করণ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি একে "সমাজতন্ত্রবিহীন ফেবিয়ান সমাজতন্ত্র" বলে অভিহিত করেছিলেন।
- আইন ব্যাখ্যার অপরিহার্য নির্দেশক: অধ্যাপক কে.সি. হোয়ার উল্লেখ করেন, আদালত দিয়ে সরাসরি বলবৎ না হলেও যেকোনো নতুন আইনের সাংবিধানিক বৈধতা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো সর্বোচ্চ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।
আদালতে বলবৎযোগ্যতা: বাংলাদেশের বিচারিক নজির ও বিবর্তন
দ্বিতীয় ভাগের 'মূলনীতি' এবং তৃতীয় ভাগের 'মৌলিক অধিকারের' আইনি সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এসেছে:
১. কঠোর অন-বলবৎযোগ্যতা: কুদরত-ই-এলাহী পনীর বনাম বাংলাদেশ (১৯৯২)
কুদরত-ই-এলাহী পনীর বনাম বাংলাদেশ (৪৪ DLR AD ৩১৯) মামলায় উপজেলা পরিষদ বাতিল অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৯ ও ১১ অনুচ্ছেদের (স্থানীয় শাসন ও গণতন্ত্র) পরিপন্থী দাবি করে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ ঐতিহাসিক রায়ে বলেন:
"সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত মূলনীতিসমূহ সংবিধানের সংজ্ঞামতে 'আইন' নয়... এগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। রাষ্ট্র যদি এগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত সরকারকে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিতে পারে না।"
আদালত স্পষ্ট করেন যে কেবল দ্বিতীয় ভাগের কোনো মূলনীতির সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হওয়ার কারণে সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোনো আইনকে আদালত অবৈধ বা বাতিল ঘোষণা করতে পারে না।
মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের মাত্র দুই বছর পর, বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে আরেকটি ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। ২০১৪ সালের ৭ জুলাই, নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আর্বিটেশন (PCA) এই রায় ঘোষণা করে।
২. জৈব সমন্বয়বাদ: অষ্টম সংশোধনী মামলা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
এর বিপরীতে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ (৪১ DLR AD ১৬৫, ১৯৮৯) অর্থাৎ ঐতিহাসিক অষ্টম সংশোধনী মামলায় বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী এক ভিন্নধর্মী সমন্বিত মতবাদ তুলে ধরেন:
"সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগ পরস্পর পরিপূরক। দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়িত না হলে তৃতীয় ভাগে নিশ্চিত মৌলিক অধিকারগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে।"
আধুনিক জনস্বার্থ মামলাগুলোতে (PIL) আদালত ৩২ অনুচ্ছেদের 'বাঁচার অধিকার'-এর পরিধিকে প্রসারিত করতে দ্বিতীয় ভাগের ১৮ অনুচ্ছেদ (জনস্বাস্থ্য) এবং ১৮ক অনুচ্ছেদকে (পরিবেশ সংরক্ষণ) কাজে লাগিয়েছেন। ফলে প্রত্যক্ষভাবে বলবৎ না হলেও পরোক্ষভাবে মৌলিক অধিকারের ঢালে দ্বিতীয় ভাগ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
আর্থ-সামাজিক অধিকার কি বলবৎযোগ্য করা উচিত?
বিশ্বের আধুনিক সংবিধানগুলোতে এখন আর নাগরিক-রাজনৈতিক অধিকার এবং আর্থ-সামাজিক অধিকারের মধ্যে কৃত্রিম দেওয়াল রাখা হচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৯৬ সালের সংবিধানে খাদ্য, বাসস্থান ও সুপেয় পানির অধিকারকে আদালতে সরাসরি বলবৎযোগ্য করা হয়েছে ('প্রাপ্ত সম্পদের ভিত্তিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন' নীতির অধীনে)।
ভারতে সুপ্রিম কোর্ট মিনার্ভা মিলস (১৯৮০) মামলায় ঘোষণা করেছিলেন যে মৌলিক অধিকার এবং নির্দেশক নীতি হলো একই রথের দুটি চাকা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজস্ব সক্ষমতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের মতো জরুরি অধিকারগুলোকে ক্রমান্বয়ে আদালতে বলবৎযোগ্য মৌলিক অধিকারে রূপান্তর করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
উপসংহার
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি কোনো নিষ্ক্রিয় অলঙ্কার নয়; এটি রাষ্ট্রের বিবেক। ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির কারণে আদালত হয়তো বাজেটের অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দিতে পারে না, কিন্তু আইন প্রণয়নকারী ও শাসকদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন ও সমতা প্রতিষ্ঠাই রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব।




