মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার আকাক্ষা এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পৃথিবীর বহু প্রান্তে আইনের শাসনের স্থান দখল করে নিয়েছে ভয়ের রাজত্ব, যেখানে নাগরিক অধিকারকে পদদলিত করে শাসকগোষ্ঠী কায়েম করে একনায়কতন্ত্র। স্বৈরতন্ত্রের অনিবার্য অনুষঙ্গ হলো মানুষের মৌলিক অধিকার—বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমকে নির্মমভাবে ধ্বংস করা। বিংশ শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী স্বৈরশাসন থেকে শুরু করে একুশ শতকের কৃত্রিম নির্বাচননির্ভর কর্তৃত্ববাদ পর্যন্ত সর্বত্রই নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখে ক্রমাগত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা অত্যন্ত প্রকট। বিরোধী রাজনৈতিক মত দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় পেটোয়া বাহিনীতে রূপান্তর, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বৈরাচারের রূপরেখাকে উন্মোচিত করেছে।
স্বৈরতন্ত্র কী?
স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র হলো এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ক্ষমতা একক কোনো ব্যক্তি, সামরিক জান্তা বা একক কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে নিরঙ্কুশভাবে কেন্দ্রীভূত থাকে এবং যেখানে কোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বা ক্ষমতার পৃথকীকরণ থাকে না। এখানে নাগরিক স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়, গণমাধ্যমকে কঠোর সেন্সরশিপে বন্দি রাখা হয় এবং ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে নির্বিচারে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশ্রয় নেওয়া হয়।
ইতিহাসের পাতা থেকে: স্বৈরাচার ও মানবাধিকারের বিপর্যয়
মানব ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই স্বৈরতন্ত্র কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান ছিল, তবে বিংশ শতাব্দীতে তা প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার রূপ লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানি ছয় মিলিয়ন ইহুদি ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার জঘন্যতম ইতিহাস রচনা করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্তালিনের গুলাগ বন্দিশিবির ও নির্বিচার রাজনৈতিক নিধনযজ্ঞ, মাও সেতুংয়ের চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে মানবিক বিপর্যয় কিংবা কম্বোডিয়ায় পল পটের খেমাররুজ বাহিনীর গণহত্যা প্রমাণ করে যে, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ববাদ কীভাবে মানব জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে।
করফু চ্যানেল মামলা (১৯৪৯)-এর ঘটনা, আইনি ইস্যু এবং ICJ-এর ঐতিহাসিক রায় সম্পর্কে জানুন। ইনোসেন্ট প্যাসেজ ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।
একুশ শতকে এসে স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃতি আরও ধূর্ত রূপ ধারণ করেছে। উত্তর কোরিয়ার মতো প্রকাশ্য বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের পাশাপাশি মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কিংবা তথাকথিত একদলীয় আধিপত্যমূলক নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পতিত আওয়ামী লীগ শাসনামল ছিল আধুনিক হাইব্রিড ফ্যাসিবাদের এক জ্বলন্ত নিদর্শন। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল, শত শত মানুষকে বলপূর্বক গুম করা হয়েছিল এবং ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল—যার অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।
আরো পড়ুনঃ মানবাধিকার সংরক্ষণ ও প্রসারের আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া ও নীতিমালা
মানবাধিকারের ওপর স্বৈরতন্ত্রের ধ্বংসাত্মক অভিঘাত
স্বৈরতন্ত্রের বিস্তার কোনো রাষ্ট্রের সমাজদেহে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে, তার কয়েকটি প্রধান দিক হলো:
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
১. নাগরিক স্বাধীনতার বিনাশ: মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, সমাবেশ করার অধিকার এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ হিসেবে তকমা দেওয়া হয় এবং কালো আইনের মাধ্যমে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
২. বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, ক্রসফায়ার এবং আয়নাঘরের মতো বেআইনি আটকাদেশকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করা হয়।
দীর্ঘ চার দশকের জট এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর, জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অফ দ্য সি (ITLOS)-এর ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার সমুদ্রসীমা বিরোধ-এর শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটে।
৩. অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও অলিগার্কি: জবাবদিহিহীন স্বৈরতন্ত্রে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ব্যাংক লুট, অর্থপাচার এবং রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্পের নামে জনগণের করের টাকা লুটপাট করে একদল তোষামোদকারী অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি করা হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে।
৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন: নিজের অন্যায় শাসনকে আড়াল করতে স্বৈরশাসকেরা সমাজে বিভাজনের রাজনীতি উসকে দেয় এবং বিভেদ তৈরি করে শাসন করার ঔপনিবেশিক নীতি অনুসরণ করে।

উন্নয়নের অজুহাতে কি স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করা যায়?
স্বৈরশাসকেরা প্রায়শই যুক্তি দেখায় যে, দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রয়োজন। তাদের দাবি, গণতান্ত্রিক তর্কবিতর্কের দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় বলেই স্বৈরতন্ত্রে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার হরণ করে অর্জিত কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন না থাকলে যে কথিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, তা শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি, চরম বৈষম্য এবং ঋণের জালে জড়িয়ে শ্রীলঙ্কা বা জিম্বাবুয়ের মতো রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত হয়। মানুষের সম্মান, জীবনের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়ে কোনো অবকাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী গৌরব বয়ে আনতে পারে না।
উপসংহার
মানবাধিকার কোনো শাসকের দয়া বা অনুদান নয়; এটি প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন যতই রক্তক্ষয়ী হোক না কেন, মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে দাবিয়ে রাখা যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি স্বৈরশাসকই শেষ পর্যন্ত জনগণের গণপ্রতিরোধের মুখে ধুলায় মিশে গিয়েছে। বিশ্বজুড়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি।




