সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নিষ্পেষণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একচ্ছত্র আধিপত্য এবং বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) আয়োজন করে 'ভারত জোড়ো যাত্রা'। এই পদযাত্রাটি ছিল দেশের বহুত্ববাদী চরিত্র পুনরুদ্ধার, ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক গণউদ্যোগ।
ভারত জোড়ো যাত্রা কী?
ভারত জোড়ো যাত্রা হলো দক্ষিণ ভারতের কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয়ে উত্তরের জম্মু ও কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তৃত ৪,০৮০ কিলোমিটার (২,৫৪০ মাইল) দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা। ২০২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এই যাত্রার সূচনা হয় রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে। দীর্ঘ ১৪৬ দিনে ১২টি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল অতিক্রম করে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শ্রীনগরে গিয়ে এটি সমাপ্ত হয়।
গত বুধবার ভারতের কর্ণাটকের মেয়ে মুসকান খান বেশ ঝড় তুলেছে, প্রতিবাদের ঝড়। এবং এই ঝড়কে প্রতিরোধের ঝড় বলাটাও মনে হয়না ভুল হবে। আর এই ঝড়ের ঝড়ো হাওয়া ভারতের প্রতিবেশীদের নাড়িয়ে দিয়েও সারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সারা বিশ্ব মুগ্ধ মুসকানের এই প্রলয়ঙ্করী আবির্ভাবে। যে গুণ নিজের জন্য আবশ্যক হলেও, যারা ঘরের কোনে ঘাপটি মেরে বসে থাকে তবু প্রতিবাদ করে না অন্যায়ের, তারাও মুসকানের এই ‘একাই একশো’ রূপ দেখে বিমুগ্ধ, বিমোহিত।

'ভারত জোড়ো' শব্দটির অর্থ হলো ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ে মহাত্মা গান্ধীর ডান্ডি মার্চ এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এটি ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম পদযাত্রার একটি। এর উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক বিদ্বেষ দূর করে নাগরিক সংহতি ও ভাতৃত্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন
আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।
যাত্রার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভারত জোড়ো যাত্রার পেছনে তিনটি মৌলিক সংকট কাজ করেছে:
গত ১২ই মে, ২০২৫ সাবেক শাসক দল আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকারের প্রজ্ঞাপন জারির পর এবার আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করল নির্বাচন কমিশন।
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজন: হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং ভারতের সংবিধানের মৌলিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর আঘাত প্রতিহত করা।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্ব: আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, যুব বেকারত্ব, কৃষক সংকট এবং মুষ্টিমেয় কর্পোরেট অলিগার্কদের হাতে জাতীয় সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।
- গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পতন: কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর (ইডি, সিবিআই) রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং মূলধারার কর্পোরেট মিডিয়ার দলদাস ভূমিকার বিরুদ্ধে সরাসরি জনগণের দরবারে পৌঁছানো।

জনপ্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ফলাফল
ক্ষমতাসীন বিজেপি এই যাত্রাকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক জনসংযোগ স্টান্ট এবং ক্ষীয়মাণ রাজবংশীয় ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বলে সমালোচনা করে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং কৃষকদের ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই পদযাত্রাকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়। রাহুল গান্ধী এই যাত্রার দর্শন তুলে ধরে বলেছিলেন: "নফরত কি বাজার মে, মহব্বত কি দুকান খোল রাহা হুঁ" (বিদ্বেষের বাজারে ভালোবাসার দোকান খুলছি)।
এই যাত্রা রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং কংগ্রেসের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় উগ্রবাদের বাইরেও গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাজনীতির একটি বিশাল ক্ষেত্র ভারতে আজও জীবিত রয়েছে।
উপসংহার
ভারত জোড়ো যাত্রা কেবল একটি দলীয় পদযাত্রা ছিল না; এটি ছিল ভারতের আত্মার খোঁজে এক দীর্ঘ পদচারণা। ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতির মুখে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের যে বার্তা এই যাত্রা দিয়েছে, তা ভারতের আগামী দিনের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।



