Switch language / ভাষা পরিবর্তন করুন

সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্বঃ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী থেকে ষোড়শ সংশোধনী

সারকথা

সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংবিধানের মৌল কাঠামো ধ্বংস করতে পারে না। আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলা থেকে ষোড়শ সংশোধনী পর্যন্ত বাংলাদেশের মৌল কাঠামো তত্ত্বের আইনি বিকাশ বিশ্লেষণ।

রাকিবুল ইসলাম
লিখেছেন:রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬•পড়তে ১৪ মিনিট লাগবে
সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্বঃ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী থেকে ষোড়শ সংশোধনী

সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে। কিন্তু সংসদ কি সংবিধানের এমন কোনো অংশ বদলে দিতে পারে, যা সংবিধানের মূল পরিচয়ই নষ্ট করে দেয়? প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই কি গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবিধানের প্রাধান্য বা জনগণের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দেওয়া যায়?

এই প্রশ্ন থেকেই উপমহাদেশের সাংবিধানিক আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এসেছে, সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্ব বা Basic Structure Doctrine।

এই তত্ত্বের মূল কথা হলো: সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংশোধনের নামে সংবিধানের মৌল কাঠামো ধ্বংস করতে পারে না। বাংলাদেশে এই তত্ত্ব প্রথম শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলায়, যা অষ্টম সংশোধনী মামলা নামে পরিচিত। পরে পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী-সংক্রান্ত বিচারধারায় এই তত্ত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই আররটিকেলে আমরা দেখব, মৌল কাঠামো তত্ত্ব কী, এর উৎস কোথায়, বাংলাদেশে এটি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, কোন বৈশিষ্ট্যগুলো সংবিধানের মৌল কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, এবং ষোড়শ সংশোধনী রায় পর্যন্ত এই তত্ত্ব কীভাবে সংসদের সংশোধন ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করেছে।

সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ

  • সংসদের সংবিধান সংশোধন ক্ষমতা বিস্তৃত, কিন্তু সীমাহীন নয়।
  • সংবিধানের মৌল কাঠামো ধ্বংস করে এমন সংশোধনী আদালত বাতিল করতে পারে।
  • বাংলাদেশে এই তত্ত্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh, ৪১ DLR (AD) ১৬৫ মামলায়।
  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংবিধানের প্রাধান্য, জনগণের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ মৌল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
  • ষোড়শ সংশোধনী মামলায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় মৌল কাঠামো তত্ত্ব আবারও কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
  • Article 7B সংবিধানের কিছু মৌলিক বিধানকে অসংশোধনযোগ্য হিসেবে সংরক্ষণ করেছে, তবে এর ব্যাখ্যা ও পরিসর নিয়ে বিতর্ক আছে।

মৌল কাঠামো তত্ত্ব কী?

মৌল কাঠামো তত্ত্বের অর্থ হলো, একটি সংবিধানের এমন কিছু ভিত্তিগত বৈশিষ্ট্য থাকে, যেগুলো সেই সংবিধানের পরিচয় নির্ধারণ করে। সংসদ সাধারণ বিধান, প্রতিষ্ঠানগত বিন্যাস বা পদ্ধতিগত বিষয় সংশোধন করতে পারে। কিন্তু এমন কোনো সংশোধন করতে পারে না, যা সংবিধানের মূল পরিচয় ধ্বংস করে।

একটি ভবনের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। ভবনের রং, দরজা, জানালা বা অভ্যন্তরীণ বিন্যাস বদলানো যায়। কিন্তু ভিত্তি ও প্রধান কাঠামো ভেঙে ফেললে সেটি আর আগের ভবন থাকে না। সংবিধানও তেমনি। সংশোধন করা যায়, কিন্তু সংশোধনের নামে সংবিধানকে অন্য চরিত্রে রূপান্তর করা যায় না।

এই কারণে মৌল কাঠামো তত্ত্বকে সংবিধানের আত্মরক্ষার নীতি বলা যেতে পারে। এটি সংসদের সংশোধন ক্ষমতাকে অস্বীকার করে না; বরং সেই ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নির্ধারণ করে।

সংসদের সংবিধান সংশোধন ক্ষমতা ও আর্টিকেল ১৪২ (Article 142)

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেয়। সাধারণভাবে, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন।

কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন হলো: “সংশোধন” বলতে কী বোঝায়?

যদি কোনো পরিবর্তন সংবিধানের ভেতরে থেকেই সংবিধানকে স্পষ্ট, কার্যকর বা যুগোপযোগী করে, সেটি সংশোধন। কিন্তু যদি পরিবর্তনটি সংবিধানের ভিত্তি বদলে দেয়, যেমন গণতন্ত্রের বদলে স্বৈরতান্ত্রিক কাঠামো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বদলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অথবা সংবিধানের প্রাধান্যের বদলে সংসদীয় সর্বময়তা তাহলে সেটি আর সাধারণ সংশোধন থাকে না। সেটি কার্যত সংবিধান পুনর্লিখনের পর্যায়ে চলে যায়।

মৌল কাঠামো তত্ত্ব এখানেই সংসদের ক্ষমতার সীমা টানে।

মৌল কাঠামো তত্ত্বের উৎসঃ Kesavananda Bharati মামলা

মৌল কাঠামো তত্ত্বের আধুনিক বিচারিক জন্ম ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। ১৯৭৩ সালের Kesavananda Bharati v State of Kerala মামলায় ১৩ বিচারপতির বেঞ্চ ৭:৬ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত দেয় যে, ভারতের সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা বিস্তৃত হলেও তা সংবিধানের basic structure বা মৌল কাঠামো ধ্বংস করার ক্ষমতা দেয় না।

এই রায়ের গুরুত্ব ছিল ঐতিহাসিক। কারণ এর আগে প্রশ্ন ছিল, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কি এতটাই ব্যাপক যে সংসদ মৌলিক অধিকার বা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোও বিলোপ করতে পারে? Kesavananda মামলার উত্তর ছিল: না। সংশোধনের ক্ষমতা আছে, কিন্তু ধ্বংসের ক্ষমতা নেই।

বাংলাদেশের আদালত ভারতীয় সিদ্ধান্ত দ্বারা বাধ্য নয়। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের সাংবিধানিক ঐতিহ্যে লিখিত সংবিধান, মৌলিক অধিকার, বিচারিক পর্যালোচনা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্যে মিল আছে। তাই Kesavananda মামলার যুক্তি বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিচারধারায় গভীর প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশে মৌল কাঠামো তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা: আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলা

বাংলাদেশে মৌল কাঠামো তত্ত্ব প্রথম স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh, ৪১ DLR (AD) ১৬৫; ১৯৮৯ BLD (Spl) ১ মামলায়। এটি সাধারণভাবে অষ্টম সংশোধনী মামলা নামে পরিচিত।

অষ্টম সংশোধনীর পটভূমি

১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১০০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে হাইকোর্ট বিভাগের কয়েকটি স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার বাইরে স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে হাইকোর্ট বিভাগের একক ও অখণ্ড চরিত্র ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থায়ী বেঞ্চ গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি: অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার বিধানও ছিল। তবে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলার মূল বিচার্য বিষয় ছিল হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ ও ১০০ অনুচ্ছেদের সংশোধন; রাষ্ট্রধর্ম-সংক্রান্ত বিধান নয়।

আদালতের মূল প্রশ্ন

মূল প্রশ্ন ছিল, সংসদ কি সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা ব্যবহার করে হাইকোর্ট বিভাগের একক ও অখণ্ড কাঠামো ভেঙে দিতে পারে? আর এমন সংশোধন কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবিধানের মৌল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত

আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনীটির সংশ্লিষ্ট অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত মনে করে, হাইকোর্ট বিভাগের একক চরিত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রাধান্য সংবিধানের মৌল কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সংসদ Article 142-এর অধীনে সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে সংবিধানের মৌল কাঠামো ধ্বংস করতে পারে না।

এই মামলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট সংসদের পাস করা একটি সাংবিধানিক সংশোধনীকে মৌল কাঠামো তত্ত্বের ভিত্তিতে বাতিল করে।

সম্পর্কিত বিশ্লেষণ
মৌলিক অধিকার বলবৎকরণঃ অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২-এর অধীনে প্রতিকার কীভাবে কাজ করে

একটি অধিকার যদি লঙ্ঘিত হয় অথচ তা ফিরে পাওয়ার কোনো পথ না থাকে, তবে সেই অধিকার নিছক কাগুজে প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছু নয়। আইনের একটি প্রাচীন নীতি বলে, “যেখানে অধিকার আছে, সেখানে প্রতিকারও আছে” (ubi jus ibi remedium)। বাংলাদেশের সংবিধান তার তৃতীয় ভাগে নাগরিকদের একগুচ্ছ মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) দিয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হলে নাগরিক কোথায়, কীভাবে প্রতিকার পাবেন?

রাকিবুল ইসলাম • আইন
সম্পূর্ণ পড়ুন →

সংবিধানের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো মৌল কাঠামো?

মৌল কাঠামোর কোনো চূড়ান্ত ও নির্দিষ্ট তালিকা নেই। আদালত মামলার প্রেক্ষাপট, সংবিধানের ভাষা, উদ্দেশ্য ও সামগ্রিক কাঠামো দেখে নির্ধারণ করে কোন বৈশিষ্ট্য সংবিধানের মৌল পরিচয়ের অংশ।

বাংলাদেশের বিচারধারায় যেসব বৈশিষ্ট্য মৌল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে নিচের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের সার্বভৌমত্ব

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংসদ জনগণের প্রতিনিধি, কিন্তু জনগণের ওপরে নয়। সংসদের ক্ষমতাও সংবিধান থেকে আসে। তাই সংসদ সংবিধানকে অতিক্রম করে নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

সংবিধানের প্রাধান্য

বাংলাদেশে সংসদ সর্বোচ্চ নয়; সংবিধান সর্বোচ্চ। কোনো আইন বা সাংবিধানিক সংশোধনী সংবিধানের মৌল কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে আদালত তা পরীক্ষা করতে পারে। এটাই constitutional supremacy বা সংবিধানের প্রাধান্য।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

সংবিধানের ৯৪(৪) অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিচারিক কার্যাবলিতে স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত। আদালত যদি রাজনৈতিক চাপের অধীন হয়, তাহলে মৌলিক অধিকারও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্ষমতার পৃথকীকরণ

নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের প্রত্যেকের নিজস্ব সাংবিধানিক ভূমিকা আছে। এক অঙ্গ অন্য অঙ্গকে পুরোপুরি অধীনস্থ করতে পারে না। ক্ষমতার এই ভারসাম্য নষ্ট হলে সংবিধানের শাসন দুর্বল হয়।

গণতন্ত্র ও প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র

বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের নামে প্রণীত। গণতন্ত্র, প্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহিতা ও নির্বাচন সংবিধানের কেন্দ্রস্থলে। তাই এমন কোনো সংশোধন, যা গণতান্ত্রিক চরিত্র ধ্বংস করে, মৌল কাঠামোর প্রশ্ন তুলতে পারে।

রাষ্ট্রের একক চরিত্র

বাংলাদেশ একটি একক প্রজাতন্ত্র। রাষ্ট্রের এই unitary চরিত্র এবং তার বিচারিক কাঠামোর অখণ্ডতা অষ্টম সংশোধনী মামলায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গঠনমূলক ক্ষমতা বনাম সংশোধন ক্ষমতা

মৌল কাঠামো তত্ত্ব বুঝতে হলে দুই ধরনের ক্ষমতার পার্থক্য জানা দরকার।

গঠনমূলক ক্ষমতা

গঠনমূলক ক্ষমতা বা constituent power হলো জনগণের আদি ক্ষমতা, যার মাধ্যমে একটি সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান জনগণের নামে প্রণীত হয়েছিল। এই আদি ক্ষমতার উৎস জনগণ।

সংশোধন ক্ষমতা

অন্যদিকে সংসদের সংশোধন ক্ষমতা হলো derivative বা উদ্ভূত ক্ষমতা। সংবিধান নিজেই সংসদকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ সংসদ সংবিধানের সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান; সংবিধানের স্রষ্টা নয়।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে সংসদ সংবিধানের মৌল চরিত্র বিলোপ করতে পারে না। যে ক্ষমতা সংবিধান থেকে এসেছে, সেই ক্ষমতা সংবিধানের ভিত্তি ধ্বংসের লাইসেন্স হতে পারে না।

আদালতের এখতিয়ারঃ সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও বাংলাদেশে প্রয়োগ

Article 7B: মৌল কাঠামোর লিখিত সুরক্ষা?

বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭খ অনুচ্ছেদ বা Article 7B যুক্ত হয়। এই অনুচ্ছেদ সংবিধানের কিছু মৌলিক বিধানকে সংশোধন-অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং সংবিধানের মৌল কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত।

মৌলিক লেখা আহ্বান • CONTRIBUTORS WANTED

মেরুনপেপারে আপনার চিন্তাশীল ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করুন

আইন, রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ লিখে পৌঁছে দিন অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের কাছে।

লেখা জমা দিন →

Article 7B বাংলাদেশের সাংবিধানিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহু দেশে মৌল কাঠামো তত্ত্ব মূলত বিচারিক ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু বাংলাদেশে সংবিধানের ভেতরেই কিছু মৌলিক বিধানকে লিখিতভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে Article 7B নিয়ে বিতর্কও আছে। একদিকে এটি সংবিধানের মৌল কাঠামোকে শক্তিশালী করার চেষ্টা। অন্যদিকে প্রশ্ন আছে, কোনো বর্তমান সংসদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংশোধন ক্ষমতা এত ব্যাপকভাবে আটকে দিতে পারে কি না। আবার এটিও প্রশ্ন, Article 7B কি আদালতের মৌল কাঠামো বিশ্লেষণকে প্রতিস্থাপন করেছে, নাকি বরং সেটিকে সাংবিধানিক ভাষায় আরও শক্তিশালী করেছে?

বাস্তবতা হলো, Article 7B মৌল কাঠামো বিতর্ককে শেষ করেনি; বরং নতুন মাত্রা দিয়েছে।

পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীতে মৌল কাঠামো বিতর্ক

আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলার পর মৌল কাঠামো তত্ত্ব বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিচারধারায় একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলায় আদালত সামরিক শাসনামলের বৈধতা, সংবিধানের প্রাধান্য এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে।

পঞ্চম সংশোধনী মূলত ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে জারি করা বিভিন্ন proclamation, order ও regulation-কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আদালত পরে এ ধরনের সামরিক বৈধতাকে সংবিধানের প্রাধান্য ও গণতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখে।

সপ্তম সংশোধনীও একইভাবে সামরিক শাসনামলের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নে আদালতের পর্যালোচনার মুখে পড়ে। এসব মামলার কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল, অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলকে পরবর্তী সংসদীয় অনুমোদন দিয়ে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া যায় না, যদি তা সংবিধানের মৌল কাঠামো ও জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যায়।

ত্রয়োদশ সংশোধনী: গণতন্ত্র, নির্বাচন ও মৌল কাঠামোর জটিলতা

ত্রয়োদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নির্বাচনকে নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত করা।

২০১১ সালে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আদালতের যুক্তির একটি অংশ ছিল, নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার টানাপোড়েন।

তবে ২০২৫ সালে আপিল বিভাগ আগের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনরুজ্জীবিত করে। পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় যে আদালত নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে দেখেছে।

এই প্রেক্ষাপট দেখায়, মৌল কাঠামো তত্ত্ব সব সময় যান্ত্রিক সূত্র নয়। কখনও কখনও আদালতকে সংবিধানের পাঠ, গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হয়।

তবে এই নিবন্ধের মূল আলোচ্য যেহেতু অষ্টম সংশোধনী থেকে ষোড়শ সংশোধনী পর্যন্ত সংসদের সংশোধন ক্ষমতার সীমা, তাই ত্রয়োদশ সংশোধনী এখানে একটি প্রাসঙ্গিক কিন্তু সহায়ক উদাহরণ হিসেবে বিবেচ্য।

ষোড়শ সংশোধনী মামলা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

মৌল কাঠামো তত্ত্বের সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে আলোচিত প্রয়োগগুলোর একটি হলো ষোড়শ সংশোধনী মামলা।

কী ছিল ষোড়শ সংশোধনী?

২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে Supreme Judicial Council ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ বা অক্ষমতার অভিযোগ বিবেচনার ব্যবস্থা ছিল।

সরকারের যুক্তি ছিল, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে বিচারক অপসারণে সংসদের ভূমিকা ছিল; তাই ষোড়শ সংশোধনী মূল সংবিধানের চেতনায় ফিরে যাওয়া।

বিশেষ সুপারিশ
কমন ল কী? কমন ল ও সিভিল ল-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য

কমন ল বা প্রথাগত আইনের ধারণাটি একটি সুগভীর আইনি ভিত্তি, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিচারিক কাঠামোর আধুনিক রূপায়ণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

রাকিবুল ইসলাম • আইন
সম্পূর্ণ পড়ুন →

কেন এটি চ্যালেঞ্জ হয়?

বিরোধী যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের প্রক্রিয়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে বিচারকদের অপসারণ প্রক্রিয়া বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়তে পারে।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৬ সালে সংশোধনীটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আপিল বিভাগ ২০১৭ সালে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। আদালতের মূল যুক্তি ছিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌল কাঠামোর অংশ। বিচারকদের নিরাপদ মেয়াদ, রাজনৈতিক চাপমুক্ত বিচারিক কাজ এবং বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে মৌল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তী review কার্যক্রমেও Supreme Judicial Council ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও Article 96-এর কার্যকর অবস্থান নিয়ে আদালত অবস্থান পরিষ্কার করে। ফলে ষোড়শ সংশোধনী মামলার কার্যকর বার্তা হলো: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু নীতিগত কথা নয়; এটি সংবিধানের মৌল কাঠামোগত শর্ত।

সংশোধনযোগ্য ও অসংশোধনযোগ্য বিষয়: পার্থক্য কোথায়?

বিষয়সংশোধনযোগ্য ক্ষেত্রমৌল কাঠামোর ক্ষেত্র
প্রকৃতিপদ্ধতিগত, প্রশাসনিক বা প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনসংবিধানের ভিত্তিগত পরিচয়
উদাহরণপ্রশাসনিক বিন্যাস, কার্যপদ্ধতি, প্রতিষ্ঠানগত সমন্বয়গণতন্ত্র, সংবিধানের প্রাধান্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
সংসদের ক্ষমতাArticle 142 অনুযায়ী সংশোধনযোগ্যসংশোধনের নামে ধ্বংস বা বিলোপযোগ্য নয়
আদালতের ভূমিকাসাধারণ সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষাসংশোধনী মৌল কাঠামো ধ্বংস করছে কি না পরীক্ষা
ফলবৈধ সংশোধন হতে পারেঅসাংবিধানিক ঘোষণা হতে পারে

মৌল কাঠামো তত্ত্বের সমালোচনা

মৌল কাঠামো তত্ত্ব নিয়ে শক্তিশালী বিতর্ক আছে। সমালোচকরা বলেন, সংবিধানে “মৌল কাঠামো” শব্দটি মূল পাঠে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ছিল না; আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই তত্ত্ব গড়ে উঠেছে। কোনটি মৌল আর কোনটি নয়, তা নির্ধারণ করছেন অনির্বাচিত বিচারকরা। এতে নির্বাচিত সংসদের ওপর বিচার বিভাগের অতিরিক্ত প্রভাব তৈরি হতে পারে।

এই সমালোচনার গুরুত্ব আছে। কারণ গণতন্ত্রে নির্বাচিত সংসদের ভূমিকা অবহেলা করা যায় না। আদালত যদি খুব সহজে রাজনৈতিক প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে বিচার বিভাগের ওপরও রাজনৈতিক বিতর্কের চাপ বাড়ে।

তবে সমর্থকদের যুক্তিও শক্তিশালী। তারা বলেন, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই যদি সংবিধানের প্রাধান্য, গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বা মৌলিক অধিকার বিলোপ করা যায়, তাহলে লিখিত সংবিধানের অর্থ কী? সংবিধান তো কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অস্থায়ী ইচ্ছার দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা নির্ধারণকারী মৌলিক আইন।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মৌল কাঠামো তত্ত্ব সংসদের শত্রু নয়। বরং এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার থেকে সংবিধানকে রক্ষা করে।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাস্তবতায় এই তত্ত্বের গুরুত্ব

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক শাসন, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে মৌল কাঠামো তত্ত্ব কেবল বইয়ের তত্ত্ব নয়; এটি বাস্তব রাজনৈতিক-আইনি ভারসাম্যের প্রশ্ন।

এই তত্ত্ব তিনটি কাজ করে।

প্রথমত, এটি মনে করিয়ে দেয় যে সংসদ শক্তিশালী হলেও সংবিধানের অধীন। দ্বিতীয়ত, এটি বিচার বিভাগকে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা দেয়। তৃতীয়ত, এটি জনগণের সার্বভৌমত্বকে কেবল নির্বাচনী সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাংবিধানিক ন্যায়, অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত করে।

তবে এই তত্ত্ব ব্যবহারে আদালতেরও সতর্কতা দরকার। প্রতিটি রাজনৈতিক বিতর্ককে মৌল কাঠামোর প্রশ্নে রূপান্তর করলে তত্ত্বটির শক্তি কমে যেতে পারে। মৌল কাঠামো তত্ত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য এটি ব্যবহার করতে হবে সংবিধানের সত্যিকারের ভিত্তিগত প্রশ্নে।

উপসংহার

সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্ব বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। এটি সংসদের সংশোধন ক্ষমতাকে অস্বীকার করে না; বরং সেই ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমা নির্ধারণ করে।

আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মামলায় এই তত্ত্ব বাংলাদেশে বিচারিক স্বীকৃতি পায়। পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী মামলায় এটি সামরিক বৈধতার বিরুদ্ধে সংবিধানের প্রাধান্য রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী বিতর্ক দেখায়—গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন কখনও সরল নয়। আর ষোড়শ সংশোধনী মামলায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় এই তত্ত্ব আবারও সামনে আসে।

সবশেষে বলা যায়, মৌল কাঠামো তত্ত্বের মূল শিক্ষা হলো: সংবিধান কোনো সাধারণ আইন নয়, এবং সংসদও সংবিধানের ওপরে নয়। জনগণের নামে প্রণীত সংবিধানের এমন কিছু ভিত্তি আছে, যা সাময়িক রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ভাঙা যায় না। সেই ভিত্তি রক্ষাই মৌল কাঠামো তত্ত্বের আসল উদ্দেশ্য।

FAQ

১. সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্ব কী?

সংবিধানের মৌল কাঠামো তত্ত্ব হলো এমন একটি সাংবিধানিক নীতি, যার মাধ্যমে বলা হয়—সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংবিধানের মৌল পরিচয় বা ভিত্তি ধ্বংস করতে পারে না।

২. বাংলাদেশে মৌল কাঠামো তত্ত্ব কোন মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয়?

বাংলাদেশে এই তত্ত্ব প্রথম স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় Anwar Hossain Chowdhury v Bangladesh, ৪১ DLR (AD) ১৬৫ মামলায়, যা অষ্টম সংশোধনী মামলা নামে পরিচিত।

৩. অষ্টম সংশোধনী মামলায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল?

আদালত অষ্টম সংশোধনীর সেই অংশ বাতিল করে, যার মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার বাইরে গঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আদালত মনে করে, এটি হাইকোর্ট বিভাগের একক চরিত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

৪. মৌল কাঠামোর উদাহরণ কী কী?

জনগণের সার্বভৌমত্ব, সংবিধানের প্রাধান্য, গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ এবং রাষ্ট্রের একক চরিত্র মৌল কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

৫. Article 7B কী?

Article 7B সংবিধানের কিছু মৌলিক বিধানকে সংশোধন-অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি মৌল কাঠামো ধারণাকে লিখিত সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার একটি চেষ্টা, যদিও এর পরিসর ও প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আছে।

৬. ষোড়শ সংশোধনী মামলার সঙ্গে মৌল কাঠামো তত্ত্বের সম্পর্ক কী?

ষোড়শ সংশোধনী মামলায় আদালত বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌল কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে বিচারক অপসারণের সংসদীয় প্রক্রিয়া বাতিল করে। পরবর্তী review পর্যায়ে Supreme Judicial Council ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়।

৭. মৌল কাঠামো তত্ত্ব কি বিচার বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতা?

এ নিয়ে বিতর্ক আছে। সমালোচকরা এটিকে বিচারিক সক্রিয়তা বলেন। তবে সমর্থকদের মতে, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার থেকে সংবিধানের প্রাধান্য, অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য রক্ষার নীতি।

রেটিং

(নতুন)

শেয়ার

পাঠকের মন্তব্য ও পর্যালোচনা

(০)
মন্তব্য করতে Google বা Facebook দিয়ে লগইন করা আবশ্যক
রাকিবুল ইসলাম
রাকিবুল ইসলাম

লেখক (Author)

আইন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজতত্ত্বের অনুসন্ধিৎসু গবেষক ও লেখক। মেরুনপেপারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর হিসেবে নিয়মিত সমসাময়িক ভূ-রাজনীতি ও সাংবিধানিক বিষয়াবলী নিয়ে লিখছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ

আরও দেখুন →
মৌলিক অধিকার বলবৎকরণঃ অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২-এর অধীনে প্রতিকার কীভাবে কাজ করেআইন

মৌলিক অধিকার বলবৎকরণঃ অনুচ্ছেদ ৪৪ ও ১০২-এর অধীনে প্রতিকার কীভাবে কাজ করে

একটি অধিকার যদি লঙ্ঘিত হয় অথচ তা ফিরে পাওয়ার কোনো পথ না থাকে, তবে সেই অধিকার নিছক কাগুজে প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছু নয়। আইনের একটি প্রাচীন নীতি বলে, “যেখানে অধিকার আছে, সেখানে প্রতিকারও আছে” (ubi jus ibi remedium)। বাংলাদেশের সংবিধান তার তৃতীয় ভাগে নাগরিকদের একগুচ্ছ মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) দিয়েছে; কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হলে নাগরিক কোথায়, কীভাবে প্রতিকার পাবেন?

১৭ জুন ২০২৬পড়ুন →
কমন ল কী? কমন ল ও সিভিল ল-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যআইন

কমন ল কী? কমন ল ও সিভিল ল-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য

কমন ল বা প্রথাগত আইনের ধারণাটি একটি সুগভীর আইনি ভিত্তি, যা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন বিচারিক কাঠামোর আধুনিক রূপায়ণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

৯ আগস্ট ২০২৩পড়ুন →
আইনের শাসনের স্বরূপ ও এর মৌলনীতিসমূহআইন

আইনের শাসনের স্বরূপ ও এর মৌলনীতিসমূহ

এই নিবন্ধে আইনের শাসনের মূলনীতিসমূহ—যেমন আইনের দৃষ্টিতে সমতা, আইনি নিশ্চয়তা, মানবাধিকার, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা—বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে। এতে আইনের শাসনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং এর বিবর্তনে দার্শনিক ও আইনবিদদের অবদান অন্বেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, আইনের শাসন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার ও সাম্য নিশ্চিতকল্পে এর নীতিসমূহ সমুন্নত রাখার গুরুত্বও এ লেখায় গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে।

২৫ মার্চ ২০২৩পড়ুন →
পরিবেশ দূষণ কী? পরিবেশ আইনের মৌলিক মূলনীতিসমূহের বিশদ আলোচনাআইন

পরিবেশ দূষণ কী? পরিবেশ আইনের মৌলিক মূলনীতিসমূহের বিশদ আলোচনা

টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরিত্রী সুরক্ষায় পরিবেশ আইনের প্রধান দার্শনিক মূলনীতিসমূহ: সতর্কতামূলক নীতি, দূষণকারী পরিশোধ করবে নীতি, টেকসই উন্নয়ন, আন্তঃপ্রজন্মীয় সমতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের অধিকার।

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩পড়ুন →

মেরুনপেপারের সাথে যুক্ত থাকুন

আইন, রাজনীতি, ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষণধর্মী সেরা প্রবন্ধগুলো প্রতি সপ্তাহে সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আমরা স্প্যাম করি না। যেকোনো সময় আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।